বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন প্রক্রিয়া জোরদার করার নির্দেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রচলিত ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন প্রক্রিয়াগুলোর ব্যবহার দ্রুততর করার নির্দেশ দিয়েছে। দেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল এবং আধুনিক করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা সম্পর্কে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে অবহিত করা হয়।

নতুন বাণিজ্য অর্থায়ন কাঠামোর বিবরণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন প্রজ্ঞাপন বা সার্কুলার অনুযায়ী, দেশের অনুমোদিত ডিলার বা অথরাইজড ডিলার ব্যাংকগুলোকে এখন থেকে সনাতন ঋণপত্রের বাইরে আরও বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ধরণের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন মাধ্যম ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত নতুন এবং পরিপূরক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অগ্রিম অর্থ প্রদান বা অ্যাডভান্স পেমেন্ট, উন্মুক্ত হিসাব বা ওপেন অ্যাকাউন্ট রপ্তানি এবং দলিলপত্র সংগ্রহ বা ডকুমেন্টারি কালেকশন পদ্ধতি। দলিলপত্র সংগ্রহ পদ্ধতির অধীনে মূলত মূল্য পরিশোধের বিপরীতে দলিলপত্র বা ডকুমেন্টস এগেইন্সট পেমেন্ট এবং স্বীকৃতির বিপরীতে দলিলপত্র বা ডকুমেন্টস এগেইন্সট অ্যাকসেপ্টেন্স অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের প্রজ্ঞাপনে পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে, প্রচলিত ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট ব্যবস্থাটি এখনো একটি বৈধ এবং ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মাধ্যম হিসেবে বহাল থাকবে। তবে এর পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান চাহিদার কথা বিবেচনা করে উন্মুক্ত হিসাবের মাধ্যমে বাণিজ্য, দলিলপত্র সংগ্রহ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন বা সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স ব্যবস্থার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়নের মধ্যে রিভার্স ফ্যাক্টরিং এবং সরবরাহকারী বা ক্রেতার অর্থায়ন প্রক্রিয়াও যুক্ত থাকবে। নতুন এই নির্দেশনার ফলে প্রচলিত ঋণপত্র ছাড়াই নির্দিষ্ট ক্রয় ও বিক্রয় চুক্তির অধীনে আমদানি লেনদেন সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে, যা প্রচলিত আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এই ক্ষেত্রে আলাদা কোনো চুক্তি না থাকলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর কোনো আর্থিক বা মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সরাসরি চাপানো হবে না।

সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এই সার্কুলারের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো সুনির্দিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন বা স্ট্রাকচার্ড সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রিভার্স ফ্যাক্টরিং ব্যবস্থা চালু করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য এবং ঋণ পাওয়ার যোগ্য ক্রেতাদের দ্বারা অনুমোদিত বা ভেরিফাইড চালানের বা ইনভয়েসের বিপরীতে সরবরাহকারীরা নির্ধারিত সময়ের আগেই তাদের পাওনা অর্থ বা পেমেন্ট পেয়ে যাবেন। এর ফলে সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের মধ্যে নগদ অর্থের প্রবাহ বা তারল্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।

বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াগুলোকে আরও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল বাণিজ্য নথিপত্র পদ্ধতির বা ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্টেশন সিস্টেমের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক বা বৈদ্যুতিন নথিপত্র, যার মধ্যে বাণিজ্যিক চালান ও পরিবহন সংক্রান্ত রেকর্ড রয়েছে, তা যথাযথ যাচাইকরণ, আইনি বৈধতা এবং সঠিক ঝুঁকি মূল্যায়নের সাপেক্ষে ব্যাংকগুলো গ্রহণ করতে পারবে। ব্যবসায়িক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে সামগ্রিক বাণিজ্য অর্থায়নের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য তারল্য বা নগদ অর্থের প্রাপ্যতা সহজ হবে এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরি সুরক্ষা বজায় রেখেই বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী হবে।

বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রধান উপাদানসমূহ

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্দেশিত বিকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রধান উপাদান ও পদ্ধতিসমূহ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বাণিজ্য অর্থায়নের প্রধান পদ্ধতিউপাদানের বিবরণ ও কার্যকারিতা
অগ্রিম অর্থ প্রদানআমদানিকারক কর্তৃক পণ্য বা সেবা পাওয়ার পূর্বে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করা।
উন্মুক্ত হিসাব রপ্তানিকোনো ঋণপত্র ছাড়াই সরাসরি চুক্তির ভিত্তিতে রপ্তানি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া।
দলিলপত্র সংগ্রহ পদ্ধতিমূল্য পরিশোধের বিপরীতে দলিলপত্র এবং স্বীকৃতির বিপরীতে দলিলপত্র প্রদানের ব্যবস্থা।
সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়নরিভার্স ফ্যাক্টরিং এবং সরবরাহকারী বা ক্রেতার অর্থায়ন সংক্রান্ত বিশেষ ব্যবস্থা।
ডিজিটাল নথিপত্র পদ্ধতিআইনি বৈধতা যাচাই সাপেক্ষে ইলেকট্রনিক চালান এবং পরিবহন রেকর্ড গ্রহণ।
ঋণপত্র বিহীন আমদানিপ্রযোজ্য নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট ক্রয় ও বিক্রয় চুক্তির অধীনে আমদানি লেনদেন।
উদ্দেশ্য ও প্রভাবতারল্য বৃদ্ধি, বাণিজ্যের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিশ্ব বাণিজ্যে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।

Leave a Comment