এনবিআর কর্মকর্তার সম্পদ অনুসন্ধান প্রতিবেদন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে বিস্তৃত ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে এমন বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফয়সাল একসময় যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কর ফাইল প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে বিপুল অর্থ অর্জন করেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি বগুড়ায় অতিরিক্ত কর কমিশনার হিসেবে চলতি দায়িত্বে রয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তার নিজের নামসহ মোট চৌদ্দ জন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে প্রায় সতেরো কোটি একুশ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আরও গভীর তদন্তে এই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় আঠারো কোটি ষোল লাখ টাকায় পৌঁছায়। এসব সম্পদের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় জমি, ফ্ল্যাট ও প্লটের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র এবং শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে। কমিশনের ধারণা, এসব সম্পদের একটি বড় অংশ বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, সম্পদের একটি অংশ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করে অবৈধ অর্থকে বৈধ আয়ের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অনুসন্ধানে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে সম্পদের প্রকৃত উৎস, অর্থ স্থানান্তরের ধরণ এবং সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির ভূমিকা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ফয়সাল ছাড়াও তার স্ত্রী, শ্যালক, শাশুড়ি, শ্বশুর, মা, ভাই, বোনসহ মোট চৌদ্দ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তর ও গোপনের মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

কমিশন জানিয়েছে, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আরও তথ্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্পদের পূর্ণাঙ্গ উৎস, আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশদভাবে বিশ্লেষণ শেষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্পদের সারসংক্ষেপ

সম্পদের ধরনআনুমানিক মূল্যবিবরণ
স্থাবর সম্পদ (ফ্ল্যাট, প্লট, জমি)বড় অঙ্কের অংশরাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় অবস্থিত
ব্যাংক আমানতপ্রায় ছয় কোটি ছিয়ানব্বই লাখ টাকাএকাধিক নামে হিসাব রয়েছে
সঞ্চয়পত্রপ্রায় দুই কোটি পঞ্চান্ন লাখ টাকাদীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগএক কোটি সত্তর লাখ টাকার বেশিবিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার
অন্যান্য অস্থাবর সম্পদঅবশিষ্ট অংশসহ মোট প্রায় আঠারো কোটি ষোল লাখ টাকাবিভিন্ন আর্থিক সম্পদ ও স্থানান্তরিত অর্থ

দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছে, এই অনুসন্ধানের ফলাফল ভবিষ্যতে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Leave a Comment