বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে বসন্তের হাওয়া বইছে। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম ২৫ দিনেই দেশে ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে গড়ে প্রতিদিন ১০ কোটি ৩১ লাখ ডলার করে আয় দেশে এসেছে। রেমিট্যান্সের এই জোরালো প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন করে সঞ্চার করছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।
Table of Contents
রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনামূলক চিত্র ও প্রবৃদ্ধি
রবিবার (২৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রবাসী আয়ের এই তথ্য সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান ও পূর্ববর্তী বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় চলতি বছরের রেমিট্যান্স প্রবাহে এক বিশাল উল্লম্ফন ঘটেছে।
চলতি এপ্রিল (১-২৫ তারিখ): ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
গত বছরের এপ্রিল (একই সময়): ২২৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
আগের বছরের চেয়ে বৃদ্ধি: প্রায় ৩২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এপ্রিল মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোতে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মাস শেষে প্রাপ্তি ৩০০ কোটি ডলারের ঘর অনায়াসেই অতিক্রম করতে পারে। গত বছরের তুলনায় এই দৃশ্যমান প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট ও ডলারের অস্থিরতা নিরসনে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
অর্থবছর ভিত্তিক অভাবনীয় সাফল্য
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থাৎ জুলাই মাস থেকে চলতি ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময়কালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৮৭৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের ঠিক একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের আর্থিক খাতের কাঠামোগত স্থিতিশীলতায় এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ও দেনা পরিশোধের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বৈধ পথে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে উন্নত অ্যাপ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করেছে। এর পাশাপাশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (MFS) মাধ্যমে রেমিট্যান্স বিতরণের পরিধি প্রান্তিক গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় হুন্ডির চেয়ে বৈধ পথেই প্রবাসীরা বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
ঐতিহাসিক রেকর্ড ও সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত মার্চ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একক কোনো মাসে আসা এটিই ছিল সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড। মার্চের সেই অভূতপূর্ব সাফল্যের রেশ এপ্রিল মাসেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে রেকর্ডসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি হওয়ায় এবং বিশ্ববাজারে ডলারের বিনিময় হার প্রবাসীদের অনুকূলে থাকায় রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উৎসবকালীন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট রেমিট্যান্স বাড়াতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। সাধারণত দুই ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে পরিবারের বড় খরচের প্রয়োজনে বেশি অর্থ পাঠান। চলতি এপ্রিল মাসেও উৎসব পরবর্তী ও পূর্ববর্তী পারিবারিক চাহিদা মেটাতে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
ভৌগোলিক উৎস ও ব্যাংকিং চ্যানেলের ভূমিকা
রেমিট্যান্স আহরণে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন সমানে পাল্লা দিচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসছে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে:
সৌদি আরব: বরাবরের মতো শীর্ষ উৎস হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: দুবাই ও আবুধাবিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অর্থ পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যান্য দেশ: কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন থেকে আসা প্রবাহ অত্যন্ত স্থিতিশীল।
পশ্চিমা দেশ: রেমিট্যান্সের উৎসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, যেখান থেকে বড় অঙ্কের প্রবাসী আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করছে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব
বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা ও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই ক্রান্তিকালে রেমিট্যান্সের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেশের আমদানি এলসি (LC) সেটেলমেন্টের দায় মেটাতে এবং ডলার সংকটের কারণে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে ‘সেফটি নেট’ হিসেবে কাজ করছে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেলের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রবাসীরা সচেতন হচ্ছেন। অবৈধ মানি ট্রান্সফারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং দ্রুততম সময়ে পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা বৈধ পথের প্রসার ঘটিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্বের শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে যাবে।
রেমিট্যান্স পরিস্থিতির গাণিতিক সারসংক্ষেপ:
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান (মার্কিন ডলারে) |
| এপ্রিলের প্রথম ২৫ দিনে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স (২০২৬) | ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ |
| প্রতিদিনের গড় রেমিট্যান্স প্রবাহ | ১০ কোটি ৩১ লাখ |
| গত বছরের এপ্রিলের একই সময়ের রেমিট্যান্স | ২২৫ কোটি ১০ লাখ |
| চলতি অর্থবছরে মোট প্রাপ্তি (জুলাই থেকে ২৫ এপ্রিল) | ২,৮৭৮ কোটি ৭০ লাখ |
| গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার | ১৯.৮০% |
| গত মার্চের রেকর্ড রেমিট্যান্স (এক মাসের সর্বোচ্চ) | ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ |
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করছে যে, অর্থবছরের বাকি সময়টুকুতে রেমিট্যান্সের এই তেজি গতি বজায় থাকবে। যদি বর্তমান ধারা অপরিবর্তিত থাকে, তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে মোট রেমিট্যান্স প্রাপ্তি দেশের আর্থিক ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। এটি শুধু টাকার মান স্থিতিশীল রাখতেই সহায়তা করবে না, বরং বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।
