কোরবানির ঈদে নতুন টাকার চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে প্রচলিত কাগুজে মুদ্রার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর ঈদের প্রাক্কালে বাজারে নতুন নোটের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণ নতুন অর্থ বাজারে ছাড়ে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুদ্রার নকশা পরিবর্তন এবং কাঁচামালের সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদামতো নতুন নোট সরবরাহে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও টাঁকশাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঈদ উপলক্ষে প্রয়োজনীয় নতুন টাকার সংস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।

নতুন নোটের চাহিদা ও সরবরাহ সক্ষমতা

আগামী ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অন্তত ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের চাহিদা প্রদান করা হয়েছে। এই চাহিদাটি পাঠানো হয় টাকা ছাপানোর একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বা টাঁকশালের কাছে। তবে টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজ এবং কালির সংকটের কারণে তারা এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ আট হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহ করতে সক্ষম। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় জোগানে প্রায় ৫০ শতাংশ ঘাটতি থাকার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

নকশা পরিবর্তন ও বর্তমান মজুদ পরিস্থিতি

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার পুরোনো নকশা পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ নোটে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তে এই ছবিযুক্ত নোটের পরিবর্তে নতুন নকশার নোট আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাধারণত একটি নতুন নকশার নোট বাজারে আনতে ১০ থেকে ১৮ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে টাঁকশালে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের পুরোনো নকশার নোট মজুদ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ বাজারে ছাড়া সম্ভব। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে আপাতত এই ছবিযুক্ত নোটগুলো বাজারে না ছাড়ার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মুদ্রার বাজার পরিস্থিতি ও ব্যাংকিং খাতের ভল্ট

ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, ছাপানো নোটের একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে এবং ব্যবসায়ীদের হাতে থাকে। ব্যাংকগুলোর ভল্ট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত ভল্টে মুদ্রার একটি নির্দিষ্ট অংশ জমা থাকে। মুদ্রার স্থিতি সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

খাতের নামসংরক্ষিত মুদ্রার পরিমাণ (কোটি টাকায়)
ব্যাংকগুলোর শাখা ভল্ট১৬,০০০ – ২০,০০০
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের ভল্ট১৪,০০০ – ১৮,১৮,০০০
মোট সঞ্চয় (স্থাবর ও অস্থাবর)প্রায় ২৪,০০,০০০
বাজারে প্রচলিত মুদ্রার মোট চাহিদা৩,২০,০০০ – ৩,৬০,০০০

ছেঁড়া-ফাটা ও পুরোনো নোটের সমস্যা

বাজারে বর্তমানে প্রচুর পরিমাণ ছেঁড়া, ফাটা এবং অত্যধিক ময়লাযুক্ত নোট দেখা যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে এমন নোট গ্রহণ করে সমমূল্যের পরিষ্কার নোট প্রদান করবে এবং পরে সেই ত্রুটিপূর্ণ নোটগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়ে নতুন নোট সংগ্রহ করবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নতুন নোটের সরবরাহ কম থাকায় ব্যাংকগুলো চাহিদামতো নতুন টাকা পাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা পুরোনো ও ময়লাযুক্ত নোটই বাজারে প্রচলিত রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত নভেম্বর মাসে মুদ্রার মান ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে একটি বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন করলেও পর্যাপ্ত নতুন নোটের অভাবে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

সংকট নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপ

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের তথ্যমতে, নতুন নকশার নোট আনার প্রক্রিয়ার কারণেই বাজারে কিছুটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ নোটগুলো পুড়িয়ে ফেলার নিয়মিত প্রক্রিয়া থাকলেও বর্তমান চাহিদার কারণে তাতে কিছুটা ধীরগতি এসেছে। তবে সংকট মেটাতে বিমানযোগে জরুরি ভিত্তিতে টাকা ছাপানোর কাগজ ও কালি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত নতুন নোটগুলো ঈদের আগে বাজারে আসা কঠিন হবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুততম সময়ে ব্যাংকগুলোকে নতুন টাকা সরবরাহ করার মাধ্যমে বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। বর্তমানে গ্রাহকদের সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা বদলানোর সুযোগ বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

Leave a Comment