দেশের কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) শিল্পখাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা বিকাশকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন ও প্রাইম ব্যাংকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনঃঅর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সরকারের ৩০০ কোটি টাকার ‘রিভলভিং ফান্ড’-এর আওতায় বাস্তবায়িত এই উদ্যোগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ, দ্রুত এবং তুলনামূলক স্বল্প সুদের অর্থায়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির কাঠামোকে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ভূমিকা অপরিসীম। তাঁর মতে, এই খাত কেবল উৎপাদনই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সরকার এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা এবং আর্থিক কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখবে।
চুক্তির আওতায় প্রাইম ব্যাংক নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করবে। ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, যা ব্যবসার ধরন, আকার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রদান করা হবে। ঋণ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ চার বছর সময় দেওয়া হবে এবং প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা স্থিতিশীল করার সুযোগ পান।
এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তা, তরুণ আইসিটি উদ্ভাবক, আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনকারী এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট শিল্প ক্লাস্টারে উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে।
ঋণ সুবিধার প্রধান কাঠামো
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| তহবিলের উৎস | ৩০০ কোটি টাকার রিভলভিং ফান্ড |
| সুদের হার | সর্বোচ্চ ৮% বার্ষিক |
| ঋণের পরিমাণ | ১ লাখ – ২৫ লাখ টাকা |
| পরিশোধকাল | সর্বোচ্চ ৪ বছর |
| গ্রেস পিরিয়ড | ৬ মাস |
| জামানত | ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন |
| অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গোষ্ঠী | নারী, তরুণ, ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোক্তা |
১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা আনুষ্ঠানিক জামানত বাধ্যতামূলক না থাকায় নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জামানত ছাড়ের এই সুবিধা গ্রামীণ ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী বলেন, এই অংশীদারিত্ব কেবল ঋণ বিতরণ নয়, বরং দেশের উৎপাদনশীল খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ। তাঁদের মতে, এই উদ্যোগ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং শিল্পখাতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে সহায়তা করবে।
তারা আরও জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং টেকসই শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারও উৎসাহিত করা হবে। একই সঙ্গে বিদেশফেরত প্রবাসীদের উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যা দেশের মানবসম্পদ ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে CMSME খাত মোট শিল্প কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ নিয়োজিত রাখে। সহজ ও স্বল্প সুদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং শহরমুখী কর্মসংস্থানের চাপ কিছুটা কমে আসবে। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে আমদানি নির্ভরতা কমে বৈদেশিক মুদ্রার চাপও হ্রাস পেতে পারে।
সব মিলিয়ে এই চুক্তি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
