প্রবাসী আয়ে বড় উল্লম্ফন: এপ্রিলের ২৬ দিনেই দেশে এলো ২৭১ কোটি মার্কিন ডলার

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল মাসের প্রথম ২৬ দিনেই প্রবাসীরা বৈধ পথে ২৭১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) বিবেচনায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ হাজার ১৫৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এক সংবাদ সম্মেলনে রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন।

বার্ষিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও মাসিক চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ১৯.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম ২৬ দিনে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ২২৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। চলতি বছর সেই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২৭১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল (রোববার) মাত্র এক দিনেই দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি এপ্রিল মাসের প্রতিদিনের গড় আয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবাসীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার পাঠাচ্ছেন। মাসের অবশিষ্ট কয়েক দিনে এই প্রবাহ বজায় থাকলে মাস শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও নতুন রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।


অর্থবছরের সামগ্রিক অর্জন ও প্রবৃদ্ধির চিত্র

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে (১ জুলাই ২০২৫) ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সময়কালের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম সফল একটি সময়। এই সময়ের মধ্যে দেশে মোট ২ হাজার ৮৯২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স সংগৃহীত হয়েছে। পক্ষান্তরে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪০৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ে ২০.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

বিগত দুই অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনামূলক উপাত্ত:

সময়কাল (১ জুলাই হতে ২৬ এপ্রিল)রেমিট্যান্সের পরিমাণ (মার্কিন ডলারে)প্রবৃদ্ধির হার
২০২৫-২৬ অর্থবছর (বর্তমান)২,৮৯২ কোটি ৬০ লাখ ডলার২০.২০%
২০২৪-২৫ অর্থবছর (পূর্ববর্তী)২,৪০৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার

মার্চ মাসের মাইলফলক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের মার্চ মাসটি রেমিট্যান্স সংগ্রহের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ওই মাসে দেশে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স সংগৃহীত হয়েছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। মার্চের সেই ইতিবাচক ধারা এপ্রিল মাসেও অব্যাহত রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণ ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য

আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করছে:

  • বাজারভিত্তিক বিনিময় হার: মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা এবং ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আকর্ষণীয় বিনিময় মূল্য নিশ্চিত করার ফলে প্রবাসীরা হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে অধিক উৎসাহিত হচ্ছেন।

  • সরকারি ও ব্যাংকিং প্রণোদনা: রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও দ্রুততর করা হয়েছে।

  • সচেতনতা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: হুন্ডির ঝুঁকি সম্পর্কে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৈধ পথে অর্থ প্রেরণকে গতিশীল করেছে।

  • শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং তাঁদের উচ্চতর আয়ের সুফল জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের আমদানি দায় মেটানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর দীর্ঘদিনের চাপ কমিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছে। বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর এই ধারা অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট বা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Leave a Comment