ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ‘ই-লোন’ বা ই-ঋণ ব্যবস্থা চালুর নির্দেশনা দিয়েছে Bangladesh Bank। এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকরা ব্যাংকে শারীরিকভাবে উপস্থিত না হয়েই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা ব্যাংকের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ঋণের আবেদন, অনুমোদন এবং অর্থ গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
সোমবার (১১ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবার পরিসর বাড়ানো এবং গ্রাহকসেবা আরও সহজ করার লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোকে দ্রুত ই-লোন কার্যক্রম চালু করতে হবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এই ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ এটি মূলত স্বল্পমেয়াদি আর্থিক চাহিদা পূরণের জন্য নির্ধারিত একটি ঋণসুবিধা।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ই-ঋণের সুদের হার ব্যাংকগুলো নিজ নিজ বাজারভিত্তিক নীতিমালার ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে। তবে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করা হলে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এতে ঋণের সুদের ক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো বজায় থাকবে বলে নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে কিস্তি পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে। এতে কাগজপত্র নির্ভরতা কমবে এবং ব্যাংকিং সেবার গতি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহক যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল যাচাইকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকের পরিচয় সঠিকভাবে নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়া ঋণ অনুমোদনের আগে প্রতিটি গ্রাহকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিবেদন যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই যাচাইয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের পূর্ববর্তী ঋণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে নতুন ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এই ই-ঋণ সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন না।
গ্রাহক স্বার্থ সুরক্ষায় স্বচ্ছতার বিষয়টিকে সার্কুলারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঋণের সুদ, বিভিন্ন ফি, চার্জ, বিলম্ব মাশুল এবং আগাম ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত ফি—সব ধরনের তথ্য গ্রাহককে ঋণ গ্রহণের আগেই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। গ্রাহকের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা যাবে না বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিজিটাল আর্থিক সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (২এফএ), মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (এমএফএ) এবং ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ব্যবস্থার ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব ব্যবস্থা অনলাইন লেনদেনকে আরও নিরাপদ করবে এবং প্রতারণার ঝুঁকি কমাবে।
এছাড়া গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ই-লোন কার্যক্রম চালুর আগে প্রতিটি ব্যাংককে নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন গ্রহণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাংক তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে এই ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থা পরিচালনা করবে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তর আরও বিস্তৃত হবে। এতে ব্যাংকিং সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা সামগ্রিক আর্থিক সেবার দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
