বিদেশি অর্থায়নে পতন ঋণচাপ বৃদ্ধি

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বহিঃসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ ও সহায়তা হিসেবে পেয়েছে প্রায় তিনশ ঊননব্বই কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় চারশ আশি কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় উনিশ শতাংশ পতন ঘটেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় হ্রাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিও প্রত্যাশার তুলনায় কম। উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি অর্থায়ননির্ভর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে প্রায় চৌত্রিশ দশমিক ছাপ্পান্ন শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, দরপত্র প্রক্রিয়ায় জটিলতা এবং প্রশাসনিক অনুমোদনে সময়ক্ষেপণ এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।

একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি সময়ে বাংলাদেশকে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় তিনশ বাহান্ন কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় নয় শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় একশ চব্বিশ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

নতুন প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও পতন লক্ষ্য করা গেছে। আলোচ্য সময়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো মোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রায় দুইশ আশি কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ছয় দশমিক ছয় শতাংশ কম। এসব অর্থ মূলত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সামাজিক খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রতিশ্রুত।

একক দেশ হিসেবে রাশিয়া থেকে এসেছে প্রায় বাহান্ন দশমিক আট কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন, যা মোট প্রতিশ্রুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রধান সূচকসমূহের সারসংক্ষেপ

সূচকচলতি অর্থবছর (জুলাই–মার্চ)আগের অর্থবছরপরিবর্তন
বিদেশি অর্থায়ন প্রাপ্তি৩৮৯ কোটি মার্কিন ডলার৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারহ্রাস প্রায় ১৯ শতাংশ
উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হার৩৪.৫৬ শতাংশ৩৫.৮ শতাংশসামান্য হ্রাস
ঋণ পরিশোধ৩৫২ কোটি মার্কিন ডলার৩২১ কোটি মার্কিন ডলারবৃদ্ধি প্রায় ৯ শতাংশ
সুদ পরিশোধ১২৪ কোটি মার্কিন ডলারপ্রযোজ্য নয়বৃদ্ধি পেয়েছে
মোট প্রতিশ্রুতি২৮০ কোটি মার্কিন ডলার৩০০ এর বেশি কোটি মার্কিন ডলারহ্রাস প্রায় ৬.৬ শতাংশ

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিদেশি অর্থপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো না গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

Leave a Comment