দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে আরও গতিশীল করা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই সিদ্ধান্তে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৃহস্পতিবার জারি করা এক নির্দেশনায় জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মান বিবেচনা করে পৃথক সুদহার নির্ধারণ করা হবে। এতে ভালো আর্থিক অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে কম সুদে তহবিল সুবিধা পাবে।
নতুন কাঠামোয় পাঁচ বছর, সাত বছর এবং দশ বছর মেয়াদি তহবিলের জন্য আলাদা সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে। নিচের সারণিতে বিষয়টি তুলে ধরা হলো—
| ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার স্তর | পাঁচ বছর মেয়াদ | সাত বছর মেয়াদ | দশ বছর মেয়াদ |
|---|---|---|---|
| প্রথম স্তর | এক দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ | এক দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ | এক দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশ |
| দ্বিতীয় স্তর | এক দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ | এক দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশ | এক দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ |
| তৃতীয় স্তর | এক দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশ | এক দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ | দুই দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ |
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই নতুন কাঠামো আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল এবং পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করবে। ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সুদ নির্ধারণে অযৌক্তিক বৈষম্য কমবে এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সুবিধাজনক শর্তে তহবিল পাবে।
আগে দীর্ঘমেয়াদি এই তহবিলের সুদহার আন্তর্জাতিক বাজারের ভিত্তি সুদের হারের সঙ্গে অতিরিক্ত নির্দিষ্ট হার যুক্ত করে নির্ধারণ করা হতো। এতে বৈশ্বিক বাজারে সুদের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশীয় ঋণ ব্যবস্থায় পড়ত। নতুন কাঠামোয় সেই জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার দিকে যাওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে আরও নির্ভরযোগ্য করবে।
নতুন নির্দেশনায় গ্রাহক পর্যায়ের সুদহার নির্ধারণেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিল সংগ্রহ ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সুদহার নির্ধারণ করতে পারবে। তবে এই হার তহবিল ব্যয়ের তুলনায় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। পূর্বে এই সীমা ছিল এক থেকে দুই শতাংশের মধ্যে। ফলে উদ্যোক্তারা কিছুটা বেশি নমনীয়তার মধ্যে থাকলেও মোট সুদহার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
ঋণসীমাতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন একজন একক ঋণগ্রহীতা একটি ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ প্রায় এক কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। আবার একাধিক ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত ঋণ কাঠামোর ক্ষেত্রে এই সীমা সর্বোচ্চ দুই কোটি মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ বড় শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করবে।
নতুন নীতিমালা আগামী প্রথম মে থেকে কার্যকর হবে এবং এটি বিদ্যমান ও নতুন উভয় ঋণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্প খাতে বিনিয়োগের চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই নীতিগত সংস্কারের ফলে দেশে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঝুঁকি হ্রাস পেয়ে একটি স্থিতিশীল শিল্প অর্থায়ন পরিবেশ গড়ে উঠবে।
