বাংলাদেশকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সহায়তা হিসেবে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার (১.৫ বিলিয়ন ডলার) ঋণ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ সালের জুন মাসের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদ তিনটি পৃথক ঋণ কর্মসূচির আওতায় এই বিশাল অঙ্কের অর্থ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিশদ তথ্য জানা গেছে। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে এই বাজেট সহায়তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তৈরি হওয়া বিদ্যমান চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহল আশা প্রকাশ করছেন।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাটির এই ১৫০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও পৃথক খাতের সংস্কার এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাজন করে ব্যবহার করা হবে। প্রথম খাতের অধীনে, বিশ্বব্যাংকের বিশেষায়িত ‘র্যাপিড রেসপন্স অপশন’ (আরআরও) উইন্ডো থেকে চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে প্রায় ৮০ কোটি (৮০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার রূপান্তর করে এই বাজেট rescuers সহায়তায় যুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছাড় করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় খাতের অধীনে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক কাঠামো সংশোধন এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে পৃথকভাবে ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। তৃতীয় খাতের অধীনে, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনের সংকটের কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, সেজন্য জরুরি সার আমদানি এবং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুসংহত রাখতে বাকি ৩০ কোটি (৩০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও চুক্তি প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র থেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানা গেছে, এই ঋণ সহায়তার আর্থিক প্যাকেজ ও শর্তাবলি চূড়ান্ত করার পূর্বে বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি এবং বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা—উভয় স্থানেই দুই পক্ষের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কয়েক দফা সফল ও নিবিড় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষের বিস্তারিত পর্যালোচনা, অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পর্যালোচনার পর বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন authority এই অর্থায়নের বিষয়ে একমত পোষণ করে এবং ঋণ প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বাজেট সহায়তার মূল তথ্য ও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান
| সহায়তার বিবরণ ও সুনির্দিষ্ট খাত | বরাদ্দের পরিমাণ (মার্কিন ডলারে) |
| র্যাপিড রেসপন্স অপশন (আরআরও) উইন্ডো (চলমান প্রকল্প থেকে স্থানান্তরিত) | ৮০ কোটি (৮০০ মিলিয়ন) ডলার |
| আর্থিক কাঠামো ও ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম | ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) ডলার |
| জরুরি সার আমদানি ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ | ৩০ কোটি (৩০০ মিলিয়ন) ডলার |
| সর্বমোট প্রস্তাবিত বাজেট সহায়তার পরিমাণ | ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ডলার |
| অর্থ অনুমোদনের সম্ভাব্য সময়সূচি | জুন ২০২৬ মাসের শেষ সপ্তাহ |
| সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা | বিশ্বব্যাংক (আইবিআরডি ও আইডিএ) |
বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব
বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি পরিসংখ্যান, সামষ্টিক অর্থনৈতিক হিসাব ও আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সরাসরি ও নেতিবাচক প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল এবং সার আমদানির ক্ষেত্রে তীব্র সরবরাহ সংকট ও মূল্যের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলে বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (ত্রৈমাসিকে) আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ও কৃষি খাতের জন্য সার আমদানির ব্যয় এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধের পরিমাণ পূর্বনির্ধারিত বাজেটের চেয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি তথ্য অনুসারে, আন্তর্জাতিক বাজারে এই বর্ধিত আমদানি বিলের দায় মেটাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা সরকারি তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২৬১ কোটি মার্কিন ডলারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত আমদানির দায় পরিশোধের চাপ দেশের সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ও টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। এই বিশেষ অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২০২৬ সালের জুনের শেষ নাগাদ প্রাপ্তব্য এই ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বাজেট সহায়তা বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক ঘাটতি পূরণ, অভ্যন্তরীণ তারল্য সংকট নিরসন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করবে। এই অর্থায়নের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হবে বলে সরকারি দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
