বৈদেশিক লেনদেন ও ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা বহির্গমন এবং তফশিলি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে দুটি পৃথক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে। পরিবহন সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে এবং ব্যাংকিং খাতের জনবলকে আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।

পরিবহন সেবার বৈদেশিক লেনদেনে সমন্বিত নীতিমালা

গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিবহন সেবার সাথে যুক্ত বৈদেশিক মুদ্রা বহির্গমন প্রক্রিয়ার জন্য একটি একক ও সমন্বিত নীতিমালা প্রকাশ করেছে। ইতিপূর্বে এই সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো বিভিন্ন সময়ে পৃথকভাবে জারি করা হয়েছিল, যা অনেক সময় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত। বর্তমান নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা, নিয়মনীতির পরিপালন নিশ্চিত করা এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা হ্রাস করা।

এই সমন্বিত নির্দেশিকাটি ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতকারী বিমান ও জাহাজের টিকিট বিক্রয়, পণ্য পরিবহনের ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে এই নিয়মাবলী প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি শিপিং লাইন, এয়ারলাইন্স, কুরিয়ার সার্ভিস এবং ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের জন্যও সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি পর্যটন সেবার সাথে যুক্ত ট্যুর অপারেটরদের লেনদেনের ক্ষেত্রেও নতুন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালাটি জারির তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য ১৪ সপ্তাহের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক

দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল তফশিলি ব্যাংকের নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য ১৪ সপ্তাহের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকিং সেবাকে আরও দক্ষ, নীতিবান এবং প্রযুক্তিবান্ধব করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশনার অধীনে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার, প্রবেশনারি অফিসার এবং সিনিয়র অফিসারসহ সকল পর্যায়ের নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এমনকি যারা পদোন্নতি পেয়ে সমমানের পদে এসেছেন কিন্তু পূর্বে বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ নেননি, তাদের জন্যও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। সফলভাবে এই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা চাকুরিতে স্থায়ীকরণের পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবসম্পদ বিভাগের মতো বিশেষায়িত বিভাগের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রশিক্ষণের সময়সীমা কিছুটা সমন্বয় করতে পারবে।

প্রশিক্ষণ কারিকুলামের প্রধান দিকসমূহ:

বিষয়শ্রেণীঅন্তর্ভুক্ত মূল বিষয়সমূহ
অর্থনীতি ও নীতিমালাসামষ্টিক অর্থনীতি, জাতীয় আয় প্রাক্কলন, রেপো, রিভার্স রেপো, নগদ জমা বা সিআরআর এবং বিধিবদ্ধ তরল সম্পদ বা এসএলআর।
ব্যাংকিং কার্যক্রমঋণ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়ন, ট্রেজারি কার্যক্রম, এসএমই ও কৃষি অর্থায়ন এবং শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং।
প্রযুক্তি ও ফিনটেকডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস), উদীয়মান প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তা।
আইন ও নৈতিক কাঠামোব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এবং হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন ১৮৮১।
পেশাগত দক্ষতাগ্রাহক সেবা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, দাপ্তরিক শিষ্টাচার এবং দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা।

প্রশিক্ষণের ধরণ ও প্রায়োগিক শিক্ষা

নতুন এই নির্দেশনায় প্রথাগত বক্তৃতানির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে কেস স্টাডি, দলগত আলোচনা, বিতর্ক এবং কুইজের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের মেধা যাচাই করা হবে। মোট ১৪ সপ্তাহের মধ্যে অন্তত ৮ সপ্তাহ তাত্ত্বিক এবং ৬ সপ্তাহ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। ব্যবহারিক শিক্ষার অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের ৫ দিনের জন্য গ্রামীণ পরিবেশে অবস্থান করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি প্রকল্প পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া ব্যাংকের মূল সফটওয়্যার ব্যবহার করে ‘মক ব্রাঞ্চ’ বা কৃত্রিম শাখায় লেনদেন অনুশীলনের মাধ্যমে ঝুঁকিহীন পরিবেশে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পাবেন প্রশিক্ষণার্থীরা। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনা জারি করেছে।

Leave a Comment