দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ইতিবাচক ধারায় প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ মানদণ্ড অনুসারে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ এখন প্রায় ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৬২ কোটি ডলারের সমান। তবে আন্তর্জাতিক হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, কিছু দায় ও নির্ধারিত কর্তন বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ৯৬ কোটি ডলার। ফলে কার্যত দেশের রিজার্ভ আবারও ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা এবং আমদানি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী আয়ের প্রবাহ। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে থাকায় ডলারের ওপর চাপ অনেকটাই কমেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আগের মতো বড় পরিমাণে ডলার বাজারে সরবরাহ করতে হচ্ছে না, যা রিজার্ভ সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি ছিল। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ডলারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে পরবর্তীতে রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হয়। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহ করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে, পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত রিজার্ভকে দুইভাবে হিসাব করে থাকে—মোট রিজার্ভ এবং ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ। মোট রিজার্ভে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব বৈদেশিক সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেখানে কিছু দায়ও বিবেচনায় আনা হয়। আর ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভে কেবল তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অংশকে হিসাব করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক রিজার্ভ পরিস্থিতি নিম্নরূপ—
| রিজার্ভের ধরন | পরিমাণ (ডলার) | ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| মোট রিজার্ভ | ৩৫.৬২ বিলিয়ন | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট বৈদেশিক সম্পদ |
| ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ | ৩০.৯৬ বিলিয়ন | আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য অংশ |
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান আরও স্থিতিশীল হবে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের ধারাবাহিকতা এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
