রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মালিকের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের আমানতকৃত প্রায় ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সপরিবারে আত্মগোপন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত এজেন্ট মালিক মো. রাসেল গত ৪ মে, ২০২৬ (সোমবার) থেকে পলাতক রয়েছেন এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট আউটলেটটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
Table of Contents
জালিয়াতির প্রেক্ষাপট ও অর্থ আত্মসাতের কৌশল
লংগদু উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত মো. রাসেল দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে এই আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি পরিচালনা করে আসছিলেন। সাধারণত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক অর্থ জমা দিলে তা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকের মূল সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা এবং গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে একটি স্বয়ংক্রিয় নিশ্চিতকরণ বার্তা (SMS) যাওয়ার কথা। কিন্তু অভিযুক্ত রাসেল ডিজিটাল ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং গ্রাহকদের সরলতাকে পুঁজি করে জালিয়াতির আশ্রয় নেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, জালিয়াতির ক্ষেত্রে রাসেল প্রধানত দুটি চাতুর্যপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন:
১. ভুয়া রসিদ প্রদান: গ্রাহকরা টাকা জমা দিতে আসলে রাসেল তাদের হাতে ব্যাংকের লোগো ও সিলযুক্ত জাল বা অফলাইন রসিদ ধরিয়ে দিতেন। গ্রাহকরা বাহ্যিক এই প্রমাণ দেখে আশ্বস্ত হতেন যে তাদের অর্থ জমা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ওই টাকা ব্যাংকের মূল সার্ভারে ইনপুট না দিয়ে রাসেল সরাসরি নিজের ব্যক্তিগত জিম্মায় রেখে দিতেন। ২. ব্যক্তিগত সমঝোতা ও অনৈতিক প্রলোভন: অনেক ক্ষেত্রে রাসেল গ্রাহকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে গিয়ে অধিক মুনাফা প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে বা ব্যক্তিগত ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ তিনি সরাসরি গ্রহণ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আহাজারি
গত সোমবার সকালে গ্রাহকরা আউটলেটে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান এবং রাসেলের ব্যক্তিগত মুঠোফোনটি বন্ধ পান। মুহূর্তের মধ্যে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ ভুক্তভোগী আউটলেটের সামনে ভিড় জমান। ভুক্তভোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। তারা তাদের জীবনের শেষ সম্বল, পেনশনের টাকা এবং কষ্টার্জিত সঞ্চয় এই আউটলেটে জমা রেখেছিলেন।
অনেকে অভিযোগ করেছেন যে, তাদের কাছে বৈধ সিলযুক্ত রসিদ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকিং স্টেটমেন্ট চেক করে দেখা যাচ্ছে তাদের অ্যাকাউন্টে কোনো ব্যালেন্স নেই। বর্তমানে অনেক পরিবার তাদের সঞ্চয় হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থান
উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে লংগদু বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আবুল কাসেম মেম্বার জানান, এই পলায়নের ঘটনাটি পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তিনি গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন যাতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
ইসলামী ব্যাংকের রাঙামাটি জেলা শাখা অফিসের কর্মকর্তা আশরাফুল এই জালিয়াতির বিষয়ে ব্যাংকের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন:
“ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, যে সকল লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে এবং যেগুলোর রেকর্ড ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত রয়েছে, সেই সকল গ্রাহকের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ। বৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে গিয়ে যদি কোনো গ্রাহক এজেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ লেনদেন বা নিয়মবহির্ভূত কোনো আর্থিক সমঝোতা করে থাকেন, তবে তার দায়ভার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না।”
আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক তৎপরতা
লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকারিয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক অবগত এবং পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী গ্রাহক আনুষ্ঠানিকভাবে থানায় লিখিত অভিযোগ বা এজাহার দায়ের করেননি, তবে মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযুক্ত মো. রাসেলকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান শুরু করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুততম সময়ে মামলা নথিভুক্ত করে অর্থ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে লংগদু বাজার ও সংলগ্ন এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষও অভ্যন্তরীণভাবে একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যাতে জালিয়াতির প্রকৃত ব্যাপ্তি এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো চক্রের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা নিরূপণ করা যায়।
