আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা ও কুরবানির পশুর হাটগুলোতে বড় অংকের নগদ আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবছর কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাজারে জালনোট চক্রের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে ১০০০, ৫০০, ২০০ ও ১০০ টাকার নোট লেনদেনে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং প্রান্তিক খামারিদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে, পশুর হাটে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন হওয়ার সুযোগে অসাধু চক্র জালনোট ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়।
Table of Contents
জালনোট বিস্তার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও আইনি সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, ঈদুল আজহা ও কুরবানির পশুর হাটে পশুর দাম পরিশোধে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। জালনোট শনাক্ত করার প্রাথমিক ও সাধারণ জ্ঞান না থাকলে ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয় পক্ষই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা প্রান্তিক খামারিরা এই চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
তাই লেনদেনের সময় তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, জালনোট তৈরি, মজুত রাখা বা প্রচলন করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ জালনোটসহ শনাক্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আসল নোট চেনার প্রধান নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসমূহ
সাধারণ মানুষ যাতে সহজেই আসল নোট শনাক্ত করতে পারেন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ১০০০, ৫০০ ও ২০০ টাকার আসল নোটে যে সকল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে, তা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
উন্নত নিরাপত্তা সুতা (Security Thread): আসল নোটের বাম পাশে একটি হলোগ্রাফিক নিরাপত্তা সুতা থাকে। নোট নাড়াচাড়া করলে এই সুতার রঙ পরিবর্তন হয় এবং এতে নোটের মান খচিত থাকে। এটি কাগজের স্তরের ভেতরে এমনভাবে সেঁটে দেওয়া থাকে যা সাধারণ উপায়ে বা নখ দিয়ে টেনে তোলা অসম্ভব।
স্বচ্ছ জলছাপ (Watermark): নোটটি আলোর বিপরীতে ধরলে সাদা অংশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রাম এবং উজ্জ্বলভাবে নোটের মান স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।
রঙ পরিবর্তনশীল কালি (OVI): ১০০০ ও ৫০০ টাকার আসল নোটের ওপরের ডান কোণায় কালিতে লেখা নোটের মানটি নাড়াচাড়া করলে রঙ পরিবর্তন হয়। ১০০০ টাকার নোটে এই রঙ সোনালি থেকে সবুজ এবং ৫০০ টাকার নোটে গাঢ় লাল থেকে সবুজে রূপান্তরিত হয়।
খসখসে বা অসমতল ছাপা (Intaglio Printing): আসল নোটের সামনের দিকে বিভিন্ন অংশে হাত দিলে উঁচু-নিচু বা খসখসে মনে হবে। বিশেষ করে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ লেখা এবং নোটের মূল মানের ওপর আঙুল বুলালে এই বিশেষ ছাপ অনুভব করা যায়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ চিহ্ন: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চেনার সুবিধার জন্য নোটের ডান পাশে বিশেষ ধরণের উঁচু ছোট ছোট বিন্দু থাকে, যা স্পর্শ করেই নোটের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
পশুর হাটে ব্যাংকিং সেবা ও নিরাপত্তা বুথ স্থাপন
পশুর হাটে জালনোটের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং লেনদেন নিরাপদ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সকল তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংককে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে। এই নির্দেশনার আলোকে দেশের প্রধান প্রধান পশুর হাটগুলোতে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অস্থায়ী বুথ স্থাপন করা হবে।
১. তাৎক্ষণিক যাচাই সেবা: পশুর হাটে লেনদেনের সময় কোনো নোট নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ হলে নিকটস্থ অস্থায়ী ব্যাংক বুথে গিয়ে কর্মকর্তাদের সহায়তা নেওয়া যাবে। সেখানে জালনোট শনাক্তকারী আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে বিনামূল্যে নোট যাচাইয়ের সুবিধা প্রদান করা হবে। ২. নগদ লেনদেনে সতর্কতা: অপরিচিত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছ থেকে বড় অংকের নোট গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে হাটের ভিড়ের সুযোগে জালনোট গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রুখতে হবে। ৩. ডিজিটাল পেমেন্ট ও ক্যাশলেস লেনদেন: জালনোটের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে সম্ভব হলে এমএফএস (বিকাশ, রকেট, নগদ) অথবা সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে। ‘স্মার্ট হাট’ প্রকল্পের আওতায় অনেক হাটে ডিজিটাল পেমেন্টের বিশেষ ব্যবস্থাও থাকবে।
জনসচেতনতা ও প্রচার কার্যক্রম
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, সচেতনতাই জালনোট চক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের ছবি ও ভিডিওসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিফলেট বিতরণ এবং ভিডিও প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
হাটে পশু বিক্রির পর খামারিরা যাতে কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে প্রতারিত না হন, সেজন্য গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পশুর হাটে সন্দেহভাজন কাউকে জালনোট লেনদেন করতে দেখলে বা অসাধু চক্রের সন্ধান পেলে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বরত পুলিশ বা ব্যাংক কর্মকর্তাদের অবহিত করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ যাতে জালনোটের আর্থিক ক্ষতির কারণে ম্লান না হয়, সেজন্য প্রতিটি লেনদেনে সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
