দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ ও বাজেট–ঘাটতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় অর্জিত না হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যের প্রায় পুরোটা আগেভাগেই ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জন্য ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লক্ষ চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু জুলাই থেকে মার্চ—এই নয় মাসেই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লক্ষ আট হাজার নয়শ পঁচাশি কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় আটাত্তর হাজার ঊনপঞ্চাশ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ত্রিশ হাজার নয়শ ছত্রিশ কোটি টাকা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আংশিক পরিশোধের ফলে মোট ঋণের স্থিতি কিছুটা কমে আসে।
নিম্নের সারণিতে ঋণের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| উৎস | ঋণের পরিমাণ (কোটি টাকা) |
|---|---|
| বাণিজ্যিক ব্যাংক | ৭৮,০৪৯ |
| কেন্দ্রীয় ব্যাংক | ৩০,৯৩৬ |
| মোট (মার্চ পর্যন্ত) | ১,০৮,৯৮৫ |
| পরিশোধের পর অবশিষ্ট | প্রায় ৯৪,০০০ |
মার্চ মাসের শেষদিকে সরকারের নগদ অর্থের চাহিদা বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিতে হয়। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করায় স্বল্প সময়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করা হয়, যা মূলত নতুন মুদ্রা সৃষ্টির মাধ্যমে আসে। যদিও দুই সপ্তাহের মধ্যে এই অতিরিক্ত ঋণ পরিশোধ করা হয়, তবু এমন পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়লে বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যা মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়, ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
চলতি অর্থবছরে প্রায় আট লক্ষ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার বড় অংশই কর ও শুল্ক থেকে আসার কথা। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রথম নয় মাসেই প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ঋণের চাপ কমাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি করণীয় সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে করজাল বিস্তৃত করা, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বিকল্প উৎস থেকে স্বল্প ব্যয়ের ঋণ সংগ্রহ। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং ভর্তুকি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসও জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
এপ্রিল মাসে সরকার কিছু ঋণ পরিশোধ করায় সাময়িকভাবে চাপ কমেছে। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
