দেশের আর্থিক খাতে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা নতুন এক কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব তফসিলভুক্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দুর্নীতি ও অর্থপাচারবিরোধী লিখিত অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই অঙ্গীকারপত্র কেবল স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দপ্তরে দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে, যাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা কোনো ধরনের দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা আর্থিক অনিয়মে জড়াবেন না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয়ও দেবেন না। একই সঙ্গে ভুয়া ঋণ, জাল কাগজপত্র, প্রতারণামূলক লেনদেনসহ সব ধরনের আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে একটি নির্ধারিত ছকও সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে সবার জন্য অভিন্ন মানদণ্ড বজায় থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়মের ঘটনায় ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঋণ প্রদানে শৃঙ্খলার অভাব এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা মনে করছে, কঠোর নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থপাচারসহ আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের পৃথকভাবে অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত প্রতারণা রোধে ঘোষণাপত্র জমা দিতে হবে। এগুলোও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রদর্শন করতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই অঙ্গীকার বাধ্যতামূলক থাকবে।
গ্রাহকদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগ পান। এজন্য দৃশ্যমান স্থানে অভিযোগ বাক্স স্থাপন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সুবিধার্থে সংকেতভিত্তিক পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
নিচে নির্দেশনার প্রধান দিকগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | নির্দেশনার সারাংশ |
|---|---|
| অঙ্গীকারপত্র | চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য বাধ্যতামূলক |
| প্রদর্শন | দপ্তরে দৃশ্যমান স্থানে রাখতে হবে |
| দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান | ঘুষ, অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা |
| ঋণ অনুমোদন | নীতিমালা বহির্ভূত ঋণ দিলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ |
| গ্রাহক অভিযোগ | অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত |
| নতুন নিয়োগ | অঙ্গীকারপত্র ছাড়া নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ নয় |
নির্দেশনায় সতর্ক করা হয়েছে, নীতিমালা উপেক্ষা করে ঋণ অনুমোদন বা যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ বিতরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভুয়া জামানত, জাল নথি কিংবা প্রতারণামূলক ঋণ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অর্থপাচারকে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগ ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সুশাসন জোরদার করা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
