ইসলামী ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব রুখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সোমবার (২২ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীলতা ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু একটি ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো আর্থিক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য, দক্ষ ও স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদ দ্রুত গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

একই দিনে সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তারা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং সম্পূর্ণ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের দাবি জানান।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ব্যাংকের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব সুশাসন ব্যাহত করছে। তাদের মতে, বর্তমান কাঠামো বজায় থাকলে আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তারা আরও দাবি করেন, পরিচালনা পর্ষদে কোনোভাবেই এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কাউকে রাখা যাবে না। পাশাপাশি ২০১৭ সালের আগের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বহালের দাবিও তোলা হয়।

আন্দোলনকারীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের আলটিমেটাম দেন এবং দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দেন।

পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট

গত কয়েক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে ধারাবাহিক আন্দোলন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা নিচে তুলে ধরা হলো—

তারিখঘটনা
১ জুনচেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনের সূচনা
১৩ জুনকেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পূর্ণ পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়
১৬ জুনপর্ষদ পুনর্গঠন ও কাঠামো পরিবর্তনের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান
২২ জুনকেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন অবস্থান ও দ্রুত পর্ষদ গঠনের ঘোষণা

এর আগে ১ জুন থেকে ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত আকার ধারণ করে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৩ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং সাময়িক প্রশাসনিক দায়িত্ব একজন নির্বাহী পরিচালকের ওপর ন্যস্ত করে।

পরবর্তীতে ১৬ জুন আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার কাঠামো পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান

কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা তৈরি হলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব ব্যাপক হতে পারে।

এ কারণে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থিতিশীল পরিচালনা কাঠামো গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকিতে রয়েছে, যেখানে মূল লক্ষ্য হলো স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে আস্থা বজায় রাখা।

Leave a Comment