দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ব্যবসায়িক মন্দার প্রেক্ষাপটে চলমান ঋণ (Continuous Loan) নবায়নের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘ আট মাস ধরে বলবৎ থাকা ‘সীমাতিরিক্ত ঋণ পরিশোধ ছাড়া নবায়ন না করার’ কড়াকড়ি নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো ঋণ গ্রহীতা মন্দ মানের খেলাপি হওয়ার আগ পর্যন্ত তার ঋণ নবায়ন করার সুযোগ পাবেন। গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে।
Table of Contents
নির্দেশনার প্রেক্ষাপট ও নতুন পরিবর্তন
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের আমলে ঋণ শৃঙ্খলায় ফিরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি কঠোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ঋণের নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ না করলে সেই ঋণ আর নবায়ন করা যাবে না। কিন্তু দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা এই নিয়মটি সহজ করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা এই শিথিলতা ভোগ করতে পারবেন।
নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় ব্যবসায়ীদের জন্য এই স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেন। মূলত দেশের শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান রক্ষার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ঋণ নবায়ন ও বিশেষ সুবিধার সংক্ষিপ্ত চিত্র
| সুবিধার ধরণ | পূর্ববর্তী অবস্থা | বর্তমান ও নতুন নির্দেশনা |
| চলমান ঋণ নবায়ন | সীমাতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ বাধ্যতামূলক ছিল। | মন্দ মানের খেলাপি না হওয়া পর্যন্ত নবায়ন সম্ভব। |
| সুবিধার মেয়াদ | তাৎক্ষণিক কার্যকর ছিল। | ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা বলবৎ থাকবে। |
| বেতন পরিশোধ ঋণ | সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণের আওতায় ছিল। | ফেব্রুয়ারির বেতনের জন্য ১ বছর মেয়াদি বিশেষ ঋণ। |
| টার্গেট গ্রুপ | সকল ঋণ গ্রহীতা। | সাধারণ ব্যবসায়ী ও রপ্তানিমুখী শিল্প মালিকগণ। |
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ তহবিল
একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ফেব্রুয়ারি মাসের শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রপ্তানি খাতে চলমান অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে চাহিদার পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্প মালিকরা এই বিশেষ ঋণের অর্থ এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করার সুযোগ পাবেন, যা তাদের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ অনেকটা লাঘব করবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিশ্লেষণ
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ নবায়নের নিয়ম শিথিল করায় সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংকের আদায় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং বৃহৎ রপ্তানি খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারল্য প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের এই ত্বরিত সিদ্ধান্ত ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী, চলমান ঋণগুলো সাধারণত এক বছরের জন্য দেওয়া হয় এবং মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হয়। আগে সীমাতিরিক্ত অংশ সমন্বয় না করলে ব্যাংকগুলো টেকনিক্যালি ঋণটিকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য হতো। এখন থেকে ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ বা ‘ডাউটফুল’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক থেকে পুনরায় অনুমোদন বা রিনিউয়াল সুবিধা পাবেন।
