প্রায় দেড় মাস বিরতির পর বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও সক্রিয় হস্তক্ষেপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে বুধবার (১৫ এপ্রিল) একক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭ কোটি মার্কিন ডলার বা ৭০ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়াকে এই পদক্ষেপের প্রধান প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এই ডলার ক্রয় সম্পন্ন করা হয়েছে মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতির মাধ্যমে। এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন ব্যাংকের প্রস্তাবিত দর যাচাই করে সর্বোত্তম মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ লেনদেনে প্রতি ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট ও কাট-অফ রেট উভয়ই ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এর আগে সর্বশেষ ২ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছিল, যেখানে কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ দেড় মাসের ব্যবধানে ডলার ক্রয়মূল্যে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বাজারের বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতির প্রতিফলন।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৫৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার (প্রায় ৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার) ক্রয় করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এই পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি, যা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকাকে নির্দেশ করে।
রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড বৃদ্ধি
ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ হিসেবে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অঙ্ক ৪৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এছাড়া এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিনে এসেছে ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ২,৭৮১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৬ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
নিচে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোর সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| সূচক | পরিমাণ |
|---|---|
| মার্চ মাসে রেমিট্যান্স | ৩৭৫.৫০ কোটি ডলার (রেকর্ড) |
| এপ্রিল (১–১৪ দিন) | ১৬০.৭০ কোটি ডলার |
| জুলাই–১৪ এপ্রিল মোট রেমিট্যান্স | ২,৭৮১ কোটি ডলার |
| বার্ষিক প্রবৃদ্ধি | ২০.৬ শতাংশ |
| গ্রস রিজার্ভ | ৩৪.৮৭ বিলিয়ন ডলার |
| BPM-6 অনুযায়ী রিজার্ভ | ৩০.২০ বিলিয়ন ডলার |
| সর্বশেষ ডলার ক্রয় | ৭০ মিলিয়ন ডলার |
নীতিনির্ধারকদের ব্যাখ্যা
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করার কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত ডলার জমা হচ্ছে, যার একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে সংগ্রহ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধরনের ডলার ক্রয় সাধারণত তখনই করা হয় যখন বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকে। এতে বিনিময় হার হঠাৎ করে কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বাজারে ভারসাম্য বজায় থাকে।
রিজার্ভ ও অর্থনীতিতে প্রভাব
বর্তমানে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ মান অনুযায়ী নিট রিজার্ভ ৩০.২০ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দেনা পরিশোধে কিছুটা স্বস্তি দিলেও জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্প কাঁচামালের উচ্চ আমদানি চাহিদা এখনো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ যদি বর্তমান ধারায় অব্যাহত থাকে, তাহলে ডলার বাজার আরও স্থিতিশীল হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে দেড় মাস পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ডলার ক্রয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ধীরে ধীরে ভারসাম্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যদিও অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
