প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক ও শক্তিশালী প্রবাহে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরে এসেছে। ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতিতে দেশের নিট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। দীর্ঘ সময় পর এই অর্জন রিজার্ভকে আবারও ৩০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকের ওপরে নিয়ে গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। একই সময়ে দেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৪ দিনে দেশে এসেছে ১ দশমিক ৬০৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা গত বছরের একই সময়ের ১ দশমিক ২৮৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, মাত্র দুই দিনেই (১৩ ও ১৪ এপ্রিল) এসেছে ১৭১ মিলিয়ন ডলার, যা রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক শক্তিশালী গতি নির্দেশ করে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৮১৬ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ০৬৯ বিলিয়ন ডলার। ফলে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিচে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রিজার্ভ পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করা হলো—
| সময়কাল | রেমিট্যান্স (বিলিয়ন ডলার) | পরিবর্তন |
|---|---|---|
| জুলাই–১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ২৩.০৬৯ | — |
| জুলাই–১৪ এপ্রিল ২০২৫ | ২৭.৮১৬ | +২০.৬% |
| এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিন | ১.৬০৭ | +২৫.২% |
| নিট রিজার্ভ (BPM-6) | ৩০.২০ | মাইলফলক অতিক্রম |
| গ্রস রিজার্ভ | ৩৪.৮৭ | বৃদ্ধি অব্যাহত |
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা বৈদেশিক খাতে সাময়িক হলেও বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ধারাবাহিক উচ্চ রেমিট্যান্স ডলার বাজারে চাপ কিছুটা কমাতে সহায়তা করছে। মার্চ মাসে একক মাস হিসেবে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ এই ইতিবাচক প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বৈধ চ্যানেলে প্রণোদনা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ সুবিধা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল ডলার বিনিময় হার। পাশাপাশি রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে অতিরিক্ত গতি দিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, রিজার্ভ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও কাঠামোগত ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং বৈশ্বিক বাজারে ডলারের অস্থিরতা ভবিষ্যতে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্প কাঁচামালের আমদানি ব্যয় এখনো অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা হিসেবে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, প্রবাসী কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে শক্তিশালী করার জন্য কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশের বৈদেশিক খাতে রেমিট্যান্সই প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। এটি একদিকে ডলার সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় নির্বাহ ও বৈদেশিক লেনদেন স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হলে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি এবং অর্থনীতির কাঠামোগত শক্তি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।
