জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক বা অফশোর ঋণের সুদের ওপর পুনরায় ২০ শতাংশ হারে আয়কর আরোপ করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। সরকারের এই নতুন প্রস্তাবনাটি আগামী জুন মাসে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হতে যাওয়া অর্থবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। অফশোর ঋণ হলো এমন একটি বিশেষ অর্থায়নের ব্যবস্থা যেখানে ঋণগ্রহীতা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে অবস্থিত ঋণদাতার কাছ থেকে সাধারণত একটি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে তহবিল বা ঋণ সুবিধা সংগ্রহ করে থাকেন।
কর আরোপের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর এই ২০ শতাংশ কর প্রথম ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে প্রবর্তন করা হয়েছিল। তবে সেই সময়ে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের তীব্র আপত্তি ও চাপের মুখে তৎকালীন সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। ফলশ্রুতিতে, ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি বিশেষ সংবিধিবদ্ধ বিধিবদ্ধ আদেশ বা এসআরও জারির মাধ্যমে এই কর মওকুফ বা অব্যাহতি প্রদান করেছিল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এই কর পুনরায় আরোপের প্রস্তাবটি ইতিমধ্যেই মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রাথমিক অনুমোদন লাভ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যখন এই কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা সঞ্চয়ের সংকটের মুখোমুখি ছিল এবং দেশের বাজারে বিদেশি তহবিলের প্রবাহ বৃদ্ধি করার একটি বিশেষ তাগিদ ছিল। তবে বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে এবং আগের সেই সংকট না থাকায় এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
দেশের কর বিশেষজ্ঞরা এই কর পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্থানীয় ঋণ এবং বিদেশি ঋণের মধ্যে কর কাঠামোর সমতা বজায় রাখার জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া এই বিষয়ে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে বা স্থানীয়ভাবে নেওয়া যেকোনো ঋণের সুদের ওপর কর পরিশোধ করতে হয়, অথচ অফশোর ঋণের সুদের ওপর এই কর মওকুফ রয়েছে।
তিনি আরও যুক্তি দেন যে, অর্থনৈতিক সমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশি ঋণের সুদের ওপর অবশ্যই কর আরোপ করা উচিত; অন্যথায় এটি দেশীয় ও বিদেশি ঋণের মধ্যে একটি বড় ধরণের বৈষম্য সৃষ্টি করে। তাছাড়া বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের অনেক দেশেরই দ্বিমুখী কর পরিহার চুক্তি রয়েছে, যার ফলে বিদেশি ঋণদাতারা বাংলাদেশে পরিশোধিত এই কর তাদের নিজস্ব দেশে কর দায়ের সাথে সমন্বয় করার সুযোগ পেয়ে থাকেন।
ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের উদ্বেগ
অপরদিকে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ এবং ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগের ফলে উৎপাদন ও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, এই কর আরোপ করা হলে বিদেশি ঋণদাতারা স্বাভাবিকভাবেই সুদের হার বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে দেশের ব্যবসায়ীদের প্রকল্প বাস্তবায়ন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। তিনি এই কর আরোপ না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বর্তমানে ডিবিএল গ্রুপের প্রায় ২০০ মিলিয়ন বা বিশ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অফশোর ঋণ রয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও একই ধরণের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই করের কারণে বাজারে বিদেশি তহবিলের প্রাপ্যতা বা জোগান হ্রাস পেতে পারে। তিনি জানান, কর আরোপিত হলে বিদেশি ব্যাংক বা সংস্থাগুলো ঋণ দিতে কম আগ্রহী হতে পারে এবং ঋণ দিলেও সুদের হার বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক ব্যবসা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
নিচে অফশোর ঋণের কর সংক্রান্ত প্রস্তাবনার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়বস্তু ও ঘটনাপ্রবাহ | সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| প্রস্তাবিত করের হার | ২০ শতাংশ (সুদের ওপর) |
| প্রস্তাবনা পেশ করার সম্ভাব্য সময় | আগামী জুন মাসের অর্থবিল |
| কর প্রথম প্রবর্তনের সময় | ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট |
| কর মওকুফের সুনির্দিষ্ট তারিখ | ২২ এপ্রিল ২০২৪ (সংবিধিবদ্ধ বিধিবদ্ধ আদেশের মাধ্যমে) |
| ডিবিএল গ্রুপের বর্তমান অফশোর ঋণ | প্রায় ২০০ মিলিয়ন বা বিশ কোটি মার্কিন ডলার |
| কর আরোপের প্রধান উদ্দেশ্য | দেশীয় ও বিদেশি ঋণের কর কাঠামোয় সমতা আনা |
ব্যবসায়িক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন যে, দেশের অভ্যন্তরে এমনিতেই ব্যবসা পরিচালনার জন্য অর্থায়নের ব্যয় অনেক বেশি, তার ওপর এই নতুন কর ব্যবস্থা অফশোর ঋণ গ্রহণকে আরও বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল করে তুলবে।
