পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবকালীন সময়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার স্বয়ংক্রিয় মুদ্রা গণনাকারী যন্ত্র বা এটিএম বুথ থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করতে গিয়ে চরম ভোগান্তি ও সংকটের মুখে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। উৎসবের ছুটিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সবকটি শাখা টানা সাত দিন বন্ধ থাকার কারণে গ্রাহকদের নগদ লেনদেনের একমাত্র প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই স্বয়ংক্রিয় বুথগুলো। এর ফলে বুথগুলোতে নগদ অর্থ উত্তোলনের জন্য সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় ও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক উৎসবের এই দীর্ঘ ছুটির দিনগুলোতে এটিএম বুথগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছিল, বাস্তব ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংকই নগদ অর্থের তীব্র সংকটে ভুগছে এবং অর্থ উত্তোলনের ওপর নিজস্বভাবে এক ধরণের সীমা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
বিভিন্ন এলাকার বুথের বাস্তব চিত্র ও নগদ অর্থের ঘাটতি
সংবাদদাতার পক্ষ থেকে রাজধানীর মালিবাগ, রামপুরা, মৌচাক, পুরানা পল্টন এবং মগবাজার এলাকার বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের এটিএম বুথগুলো সশরীরে পরিদর্শন করে দেখা গেছে যে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল আর্থিক কাঠামোর ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ বুথই পর্যাপ্ত নগদ অর্থের অভাবে সম্পূর্ণ সচল নেই বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে এবং অধিক সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের বুথগুলোতে শুধুমাত্র নিজস্ব কার্ডধারী গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিচ্ছে। তাও আবার একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারকারীরা সেই বুথ থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না।
নিচে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার এটিএম বুথের বর্তমান অবস্থা ও সংকটের ধরণ ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| পরিদর্শনের নির্দিষ্ট এলাকাসমূহ | ব্যাংকের ধরন ও অবস্থা | আরোপিত বিধিনিষেধের প্রকৃতি | গ্রাহকদের প্রধান সংকট |
| মালিবাগ, রামপুরা, মৌচাক | অপেক্ষাকৃত দুর্বল বাণিজ্যিক ব্যাংক | বুথ সম্পূর্ণ বন্ধ বা সেবা বহির্ভূত | পর্যাপ্ত নগদ অর্থের অভাব |
| পুরানা পল্টন, মগবাজার | সবল বা অনু বাধ্য ব্যাংকসমূহ | শুধুমাত্র নিজস্ব কার্ডধারীদের সুযোগ | অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারে বাধা |
আর্থিক তারল্য সংকট ও আন্তঃব্যাংক বাজার পরিস্থিতি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কার্ড বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ঈদুল আজহার ছুটির কারণে বুথগুলোতে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁদের দিনে অন্তত চারবার পর্যন্ত বুথগুলোতে নতুন করে টাকা বা নগদ অর্থ পূর্ণ করতে হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাজারে চরম তারল্য সংকটে ভোগা কিছু ব্যাংক আন্তঃব্যাংক স্পট মার্কেট বা তাৎক্ষণিক বাজার থেকে দৈনিক ভিত্তিতে অর্থ ঋণ নিয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান উৎসবের এই ছুটির সময়ে তারা সেই বাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফলস্বরূপ নিজেদের এটিএম বুথগুলোতে প্রয়োজনীয় নগদ টাকা সরবরাহ করতে পারেনি।
এর ফলে, এই সমস্ত দুর্বল আর্থিক কাঠামোর ব্যাংকের গ্রাহকেরা যখন নিজেদের বুথে টাকা পাচ্ছেন না, তখন তারা বাধ্য হয়ে অন্য সবল ব্যাংকের এটিএম বুথগুলোর দিকে ছুটছেন। এই আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানান্তরের কারণে যেসব অনু বাধ্য বা নিয়মতান্ত্রিক ব্যাংক তাদের বুথ সচল রেখেছে, তাদের ওপরও অতিরিক্ত ও দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
নিচে এটিএম বুথগুলোতে নগদ অর্থ সংকটের মূল কারণ ও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ ছকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো:
| ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অবস্থা | গৃহীত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ | আন্তঃব্যাংক বাজারের ভূমিকা | সামগ্রিক গ্রাহক ভোগান্তি |
| সবল ব্যাংকসমূহ | দিনে চারবার পর্যন্ত নগদ টাকা যুক্তকরণ | নিজস্ব গ্রাহকদের অগ্রাধিকার প্রদান | অন্য ব্যাংকের গ্রাহকের অতিরিক্ত চাপ |
| দুর্বল ব্যাংকসমূহ | বুথে অর্থ সরবরাহে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা | ঋণ সংগ্রহে অক্ষমতা বা ব্যর্থতা | গ্রাহকদের এক বুথ থেকে অন্য বুথে দৌড়ঝাঁপ |
অর্থ উত্তোলনের সীমা নির্ধারণ ও ভোগান্তির তীব্রতা
ছুটিকালীন এই তীব্র চাপের কারণে অনেক ব্যাংক অর্থ উত্তোলনের পরিমাণের ওপর সুনির্দিষ্ট সীমা বা নতুন নিয়ম বাস্তবায়িত করেছে। কিছু এটিএম বুথে অন্য ব্যাংকের ইস্যু করা কার্ডের মাধ্যমে একক লেনদেনে টাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি যেসব বুথে আন্তঃব্যাংক কার্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, সেখানেও এককালীন উত্তোলনের এই কঠোর সীমাবদ্ধতা গ্রাহকদের সংকটকে আরও বেশি বাড়িয়ে তুলেছে। উৎসবের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সময়ে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ তুলতে না পেরে সাধারণ মানুষ ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, যা তাঁদের উৎসবের আনন্দকে ব্যাহত করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর যথাযথ দূরদর্শিতা ও অর্থ ব্যবস্থাপনার অভাবই এই সংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সাধারণ ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা।
