মে মাসে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদের হার বৃদ্ধির কারণ

সাধারণত পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবের পূর্বে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার বা কল মানি বাজার সাময়িকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে বর্তমান ২০২৬ সালের মে মাসে এই আর্থিক খাতের চাপ কেবল ঈদের আগের দিনগুলোতে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মাস জুড়েই অব্যাহত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে ২৪ মে পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক কল মানি বাজারের সুদের হার টানা দুই অঙ্কের ঘরে অবস্থান করেছে। এই সময়ে দৈনিক গড় সুদের হার ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশের মধ্যে বজায় ছিল এবং সর্বোচ্চ সুদের হার বারবার ১৩ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করেছে।

তারল্য সংকট ও সুদের হারের বিস্তৃতি

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোষাধ্যক্ষ বা ট্রেজারি প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থের সম্পূর্ণ ঘাটতি নেই। তবে উদ্বৃত্ত তারল্য বা নগদ অর্থ কয়েকটি শক্তিশালী এবং ঝুঁকি এড়াতে চাওয়া ব্যাংকের কাছে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। ফলে তীব্র নগদ সংকটে থাকা দুর্বল ব্যাংকগুলো তাদের দৈনিক সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত তথা নগদ জমা সংরক্ষণের হার বা সিআরআর এবং সংবিধিবদ্ধ তারল্য হার বা এসএলআর বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য বাজার থেকে যেকোনো উচ্চ সুদের হারে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। মে মাসের শুরুতে এই ১৩ শতাংশ সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা মূলত স্বল্পমেয়াদী সাত দিনের ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে মাসের শেষ সপ্তাহে এসে এই চাপ ৯ দিন, ১০ দিন এবং এমনকি ৯১ দিনের দীর্ঘমেয়াদী মেয়াদি মুদ্রাবাজারেও ছড়িয়ে পড়ে।

বাজারের অসঙ্গতি ও দৈনিক লেনদেন

গত ৩ মে যেখানে ৯১ মেয়াদী একটি ঋণের গড় সুদের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ, সেখানে ২৪ মে এই একই মেয়াদের ঋণের গড় ও সর্বোচ্চ সুদের হার উভয়ই ১৩ শতাংশে পৌঁছায়। মে মাসে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৪ হাজার কোটি থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ লেনদেনই ছিল মাত্র এক রাতের বা ওভারনাইট ঋণের। ৪ মে সর্বোচ্চ ওভারনাইট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা এবং ১৪ মে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। মাসের মাঝামাঝি সময়ে লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে ১২ মে ৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা এবং ১৯ মে ৩ insertion হাজার ৬৩০ কোটি টাকায় নেমে আসে। লেনদেনের পরিমাণ কমলেও সুদের হার উচ্চ স্তরেই বজায় ছিল, যা নির্দেশ করে যে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া সংকুচিত করে দিয়েছে।

নিচে মে মাসের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের সুদের হার এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রধান ব্যাংকগুলোর একটি তালিকা টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের সূচকসমূহমে মাসের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান
এক রাতের বা ওভারনাইট গড় সুদের হার৯ দশমিক ৯০% থেকে ১০ দশমিক ১৯%
ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার (বিভিন্ন মেয়াদে)১৩ শতাংশ
সর্বোচ্চ দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ও তারিখ৬,০৬৩ কোটি টাকা (৪ মে)
প্রধান ঋণদাতা ব্যাংকসমূহ (উদ্বৃত্ত তারল্য)ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া।
প্রধান ঋণগ্রহীতা ব্যাংকসমূহ (নগদ সংকটে থাকা)ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ইউসিবি, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক।

সংবিধিবদ্ধ জমার নিয়ম ও ব্যাংকগুলোর বাধ্যবাধকতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের মার্চের শিথিলকৃত নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিন ন্যূনতম ৩ শতাংশ এবং দুই সপ্তাহের গড়ভিত্তিতে ৪ শতাংশ নগদ জমা বা সিআরআর সংরক্ষণ করতে হয়। এছাড়া প্রথাগত ব্যাংকগুলোর জন্য মোট দায়ের প্রায় ১৩ শতাংশ এসএলআর হিসেবে নগদ অর্থ বা সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে জমা রাখা বাধ্যতামূলক। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিল ও বন্ডে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো বা পুনঃক্রয় চুক্তি সুবিধা পায় না। ফলে তাদের আন্তঃব্যাংক বাজারের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসায় উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো সাধারণ গ্রাহকদের ঋণ না দিয়ে সেই অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ এবং আন্তঃব্যাংক বাজারে খাটানোকে অধিক নিরাপদ মনে করছে।

Leave a Comment