পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের এক বিশাল জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকেরা দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে এবং নিজ নিজ পরিবারের উৎসবের খরচ জোগাতে চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোর হিসাব যুক্ত হলে এই আয় আরও বৃদ্ধি পাবে, যার চূড়ান্ত বিবরণী এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রবাসী আয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে দেশে সর্বমোট ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। বর্তমান বাজার দর এবং দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হার অনুযায়ী এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যমান প্রায় ৩৬ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার সমান। এর আগে গত এপ্রিল মাসে দেশে ৩১৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল। অন্যদিকে, তার আগের মাসে অর্থাৎ মার্চ মাসে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল, কারণ সেই সময়ে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছিল। বিগত ডিসেম্বর মাস থেকেই দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩ বিলিয়ন বা তার বেশি পরিমাণ প্রবাসী আয় আসার একটি ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে চলতি মাসে প্রবাসী আয় আহরণে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকসমূহের অবস্থান এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র উপস্থাপন করা হলো:
| শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের নাম | সংগৃহীত প্রবাসী আয় (মার্কিন ডলারে) | সাম্প্রতিক মাসসমূহ | অর্জিত প্রবাসী আয় (মার্কিন ডলারে) |
| ইসলামী ব্যাংক | ৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার | গত ডিসেম্বর | ৩২২ কোটি ডলার |
| ব্র্যাক ব্যাংক | ৩৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার | গত জানুয়ারি | ৩১৭ কোটি ডলার |
| ট্রাস্ট ব্যাংক | ২৬ কোটি ২৮ লাখ ডলার | গত ফেব্রুয়ারি | ৩০২ কোটি ডলার |
| অগ্রণী ব্যাংক | ২১ কোটি ডলার | গত মার্চ (ঈদুল ফিতর) | ৩৭৫ কোটি ডলার (রেকর্ড) |
| পূবালী ব্যাংক | ১৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলার | গত এপ্রিল | ৩১৩ কোটি ডলার |
ব্যাংকভিত্তিক রেমিট্যান্স আহরণ এবং অর্থবছরের সার্বিক অগ্রগতি
বৈধ উপায়ে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় আনার ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক’ নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে এককভাবে এই ব্যাংকটি ৫৩ কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এনেছে। এই একই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রবাসী আয় সংগ্রহ করেছে ‘ব্র্যাক ব্যাংক’, যার পরিমাণ ৩৩ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার। ২৬ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এনে এই তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ‘ট্রাস্ট ব্যাংক’। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ‘অগ্রণী ব্যাংক’ ২১ কোটি ডলার এবং বেসরকারি খাতের ‘পূবালী ব্যাংক’ ১৩ কোটি ৭৪ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় আহরণ করতে সক্ষম হয়েছে।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচক অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত অর্থাৎ প্রথম ১০ মাসে সর্বমোট ২ হাজার ৯৩৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বাংলাদেশে এসেছে। এর বিপরীতে বিগত সম্পূর্ণ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ হাজার ৩৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় অর্জিত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন যে, কোরবানি ঈদের এই বিশেষ সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তথা মজুতকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
