বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি অর্থ ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ প্রদানের প্রবণতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের নীতি অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
রাজধানীর বনানীতে নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে জানানো হয়, চলতি বছরের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই অর্থকে অর্থনীতির ভাষায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সরাসরি বাজারে তারল্য বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি না পাওয়ায় সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংক খাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ত্রিশ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানো এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ায় অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি প্রায় তিন শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন স্তর। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেম্বার বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর মতে, যদি অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় এবং অর্থ ছাপানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
সেমিনারের সভাপতি জাইদি সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তিনি মনে করেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ
| সূচক | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ | প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা |
| মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি | প্রায় তিন শতাংশ |
| খেলাপি ঋণের হার | প্রায় ত্রিশ শতাংশ |
| বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি | প্রায় ছয় শতাংশ |
| প্রধান ঝুঁকি | মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক সংকট, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি |
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
