দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মুদ্রানীতির চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। তাঁর পর্যবেক্ষণে, চলতি বছরের মার্চ মাসে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে, যা কার্যত বাজারে নতুন অর্থ প্রবাহের সমতুল্য। এই ধরনের অর্থায়ন স্বল্পমেয়াদে তারল্য সংকট কিছুটা লাঘব করলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজধানীর বনানীতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা একমত হন যে, বর্তমান সময়ে অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
আশিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম যদি ধীরগতিতে চলতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এসব সংস্কারে বিলম্ব হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক শর্ত পূরণে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, যা বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সভায়। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ তৈরি করছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন হবে বলে তারা মত দেন।
সভাপতির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ জাইদি সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বৃহৎ কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
| সূচক | বর্তমান অবস্থা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| সরকারি ঋণ (মার্চ) | প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা | কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গৃহীত |
| মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি | ক্রমবর্ধমান | অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির প্রভাব |
| বিনিয়োগ পরিবেশ | অনিশ্চিত | জ্বালানি সংকট ও নীতিগত দ্বিধা |
| ব্যাংক খাত সংস্কার | ধীরগতিতে অগ্রসর | পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান |
| বৈশ্বিক প্রভাব | উচ্চমাত্রার চাপ | জ্বালানি ও সরবরাহ অস্থিরতা |
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ সাময়িকভাবে অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও এটি ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত না হলে আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একদিকে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ—এই দুই প্রধান চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
