বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ পুনঃতফসিলের শিথিল নীতিমালার প্রভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, ২০২৫ সালে তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিট মুনাফা অর্জন করেছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মুনাফা প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির চেয়ে নীতিগত ছাড়ের মাধ্যমেই বেশি অর্জিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
Table of Contents
সোনালী ব্যাংকের আর্থিক চিত্র ও মুনাফার উৎস
সোনালী ব্যাংক দীর্ঘ বছর ধরে মূলধন ঘাটতিতে থাকলেও ২০২৫ সালে ১,৩১৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশের বেশি। মজার বিষয় হলো, এই রেকর্ড মুনাফা এমন এক বছরে এসেছে যখন ব্যাংকটির মূল ব্যাংকিং ব্যবসায়—যেমন সুদের আয় এবং ঋণ বিতরণ—উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ব্যাংকটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিট সুদের আয় ৭৭ শতাংশ কমে ৩৩৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই ধসের মূল কারণ ছিল ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে সুদের আয় কমে যাওয়া এবং আমানতকারীদের উচ্চ হারে সুদ প্রদান করা। তা সত্ত্বেও, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া শিথিল নীতিমালার অধীনে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করায় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র তিন মাসে ২২.৩২ শতাংশ হ্রাস পায়। খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ায় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণের খরচ নাটকীয়ভাবে কমে যায়, যা ব্যাংকটিকে কৃত্রিমভাবে রেকর্ড মুনাফা দেখাতে সহায়তা করেছে।
পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ হ্রাস
২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নীতিমালার অধীনে ব্যাপক ঋণ পুনঃতফসিল অভিযান পরিচালিত হয়। এর ফলে পুরো খাতে খেলাপি ঋণ ৮৭,২৯৮ কোটি টাকা হ্রাস পায়।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল ও খেলাপি ঋণের চিত্র:
| ব্যাংকের নাম | পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ (কোটি টাকা) | খেলাপি ঋণ হ্রাসের পরিমাণ/হার |
| সোনালী ব্যাংক | – | ২২.৩২% (তিন মাসে) |
| অগ্রণী ব্যাংক | ৮,৩৬৮ | ১৫.৫৯% (৫,২৮৫ কোটি টাকা) |
| এবি ব্যাংক | ১,৩০০-এর বেশি | প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা |
| ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ | – | ১৪,০০০ কোটি টাকার বেশি |
| ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড | – | প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা |
কৃত্রিম মুনাফা ও অডিট পরবর্তী সংশোধন
সোনালী ব্যাংক ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনে ২,৬৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা এবং ২০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দাবি করেছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে খেলাপি ঋণের পুনর্মূল্যায়ন এবং উচ্চতর নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের ফলে নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে এই মুনাফা ১,৩১৩ কোটি টাকায় নেমে আসে। ব্যাংকটির একজন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, কিছু ঋণকে পুনরায় খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার ফলে মুনাফার এই সংশোধন করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর এই প্রক্রিয়া টেকসই নয়। তিনি একে মানবদেহের ‘ক্রমাগত রক্তক্ষরণ’-এর সাথে তুলনা করেছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় বা নির্বাচনের আগে ব্যবসায়ীদের খেলাপি তালিকা থেকে দূরে রাখতে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট ২০২৫’ প্রতিবেদনেও সতর্ক করা হয়েছে যে, ঋণ পুনঃতফসিল এবং পুনর্গঠন বিধিমালায় বারবার শিথিলতা আনলে ব্যাংকের সম্পদের গুণমান নিয়ে প্রকৃত সমস্যা প্রকাশ পেতে দেরি হয় এবং ব্যাংকের আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমানতকারী ও ঋণ সক্ষমতার ওপর ঝুঁকি
বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মতে, এই পুনঃতফসিল সুবিধা আমানতকারীদের কাছে ভুল বার্তা পাঠায়। ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পরিষ্কার দেখালেও প্রকৃতপক্ষে নগদ প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। দশ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা কিস্তি পরিশোধের অবকাশকালীন সময় দেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে কোনো টাকা পাচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (আইএফসি) বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই ধরনের পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ হিসেবে গণ্য করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ সীমা কমে যেতে পারে অথবা সুদের হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যার চূড়ান্ত বোঝা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের চিত্র
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বকালের সর্বনিম্ন ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ছিল ১০.১৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৫৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ।
পরিশেষে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমানের এই ‘কাগজে-কলমে’ পরিষ্কার ব্যালেন্স শিট আগামী দুই বছর পর বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। যখন গ্রেস পিরিয়ড শেষ হবে এবং এই ঋণগুলো পুনরায় খেলাপি হবে, তখন ব্যাংকের মূলধন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বারবার নীতিগত ছাড় না দিয়ে ঋণ আদায়ের প্রকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
