রাজনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে, কোনো দেশের উন্নয়ন তখনই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হয়, যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমান ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না এবং সবাই সমান সুযোগ পাবে।
রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতের উন্নয়ন বিষয়ে পিকেএসএফ এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘রেইজ’ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে অতীতের অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, পূর্ববর্তী সময়ে দেশের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা একটি সীমিত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মূলধারার অর্থনীতিতে যথাযথভাবে যুক্ত হতে পারেনি। বর্তমান সরকার সেই বৈষম্য কমিয়ে এনে অর্থনৈতিক সুযোগকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা এখনো অর্থনীতির মূলধারার বাইরে রয়েছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই অর্থনৈতিক সুযোগ পাওয়ার সমান অধিকার থাকা উচিত। শুধু রাজনৈতিক অধিকার নয়, অর্থনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।
নারীর অর্থনৈতিক ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নারীরা পরিবার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সঞ্চয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলকভাবে দক্ষ। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার ‘পরিবার কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে, যার মাধ্যমে নারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এছাড়া কৃষিখাতকে শক্তিশালী করতে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই কর্মসূচি কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, প্রণোদনা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং বাজার ব্যবস্থাও আরও সক্রিয় হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ‘রেইজ’ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষদের দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা এবং জীবিকার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক ও অনিরাপদ কর্মসংস্থানে থাকা জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সুরক্ষার আওতায় আনা এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য।
প্রধান উদ্যোগগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
| উদ্যোগের নাম | প্রধান লক্ষ্য | সুবিধাভোগী গোষ্ঠী | প্রত্যাশিত ফলাফল |
|---|---|---|---|
| রেইজ প্রকল্প | অনানুষ্ঠানিক খাতের দক্ষতা ও উন্নয়ন | শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগণ | আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা |
| পরিবার কার্ড | নারীদের আর্থিক সহায়তা ও ক্ষমতায়ন | গৃহস্থালি ও নারী সদস্যরা | পারিবারিক সঞ্চয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি |
| কৃষক কার্ড | কৃষকদের সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান | কৃষক সমাজ | কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার সম্প্রসারণ |
সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতিতে সামাজিক ন্যায়, সমান সুযোগ এবং অংশগ্রহণমূলক কাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চায়। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হলে প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
