কেন্দ্রীয় ব্যাংক একক ঋণসীমা বাড়িয়ে নীতি শিথিল করল

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতের ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনে একক ঋণগ্রহীতা বা শিল্প গ্রুপের জন্য ঋণসীমা বৃদ্ধি করেছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ কোনো একক ঋণগ্রহীতা বা শিল্প গ্রুপকে প্রদান করতে পারবে। পূর্ববর্তী নীতিমালায় এই সীমা ছিল ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নতুন এই বিধান তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে পূর্বের ১৫ শতাংশ ঋণসীমা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকগুলো বড় করপোরেট গ্রুপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আমদানিনির্ভর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণ ঋণ সুবিধা প্রদান করতে পারবে। বিশেষ করে বাণিজ্য অর্থায়ন বা ট্রেড ফাইন্যান্স কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়বে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে ঋণ বিতরণের সক্ষমতার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের মূলধন যদি ১ হাজার কোটি টাকা হয়, তাহলে পূর্ববর্তী নিয়ম অনুযায়ী সেই ব্যাংক কোনো একক গ্রুপকে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারত। নতুন নীতিমালার আওতায় একই ব্যাংক এখন সেই সীমা বাড়িয়ে ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করতে পারবে। অর্থাৎ একই মূলধনের বিপরীতে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একক ঋণগ্রহীতা সীমার পাশাপাশি নন-ফান্ডেড ঋণের ঝুঁকি-ভার নির্ধারণ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নন-ফান্ডেড ঋণের মধ্যে সাধারণত লেটার অব ক্রেডিট (এলসি), ব্যাংক গ্যারান্টি এবং অন্যান্য শর্তসাপেক্ষ দায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। এসব সুবিধা সরাসরি নগদ ঋণ না হলেও ব্যাংকের আর্থিক দায় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং একক ঋণসীমা নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নন-ফান্ডেড ঋণের মোট মূল্যের মাত্র ২৫ শতাংশ একক ঋণসীমার আওতায় গণনা করা হবে। এর আগে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ। এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য নন-ফান্ডেড অর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সীমার মধ্যে আগের তুলনায় বেশি লেটার অব ক্রেডিট ও ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করা সম্ভব হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পূর্ববর্তী নিয়ম অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের জন্য ১০০ কোটি টাকার এলসি খোলা হলে তার মধ্যে ৫০ কোটি টাকা একক ঋণসীমার অংশ হিসেবে গণনা করা হতো। নতুন বিধান অনুযায়ী একই পরিমাণ এলসির ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ কোটি টাকা ঋণসীমার আওতায় ধরা হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক এলসি সুবিধা প্রদান করতে পারবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনের অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়াবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিগত পরিবর্তনকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য অর্থায়ন সচল রাখার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চলমান চাপ, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বড় শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধনের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই শিথিলতা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর উৎপাদন ও বাণিজ্য কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধা থেকে সরাসরি উপকৃত হতে পারে।

তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আর্থিক খাতের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সতর্কতাও ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, একক ঋণগ্রহীতা সীমা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকি নির্দিষ্ট কিছু বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এর ফলে কোনো বড় করপোরেট গ্রুপ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং তা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বড় শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে ঋণ কেন্দ্রীভবন কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালে একক ঋণগ্রহীতা সীমা সংক্রান্ত নীতিমালা আরও কঠোর করেছিল। সেই সময় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সীমা নির্ধারণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

বর্তমান সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতের তারল্য প্রবাহ সচল রাখা এবং বাণিজ্য অর্থায়নের চাহিদা পূরণের একটি নীতিগত সমন্বয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর কার্যকারিতা ও প্রভাব নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা নীতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কার্যক্রমের ওপর।

Leave a Comment