খেলাপি ঋণের চাপে রূপালী ব্যাংকের বিপুল আর্থিক লোকসান

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক পিএলসি গভীর আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটি ৩৯৬ কোটি টাকার একীভূত নিট লোকসান গণনা করেছে। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, সঞ্চিতি বা প্রভিশনিং ঘাটতি বৃদ্ধি এবং মূলধন ভিত্তির দুর্বলতার কারণে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার এই বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। ব্যাংকটির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী থেকে জানা যায় যে, অনাদায়ী বা মন্দ ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, নেতিবাচক পুঞ্জীভূত আয় এবং মূলধন পর্যাপ্ততার তীব্র সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভারসাম্য বা ব্যালেন্স শিট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে গতকাল জমা দেওয়া রূপালী ব্যাংকের একটি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বিবরণী অনুসারে, জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের এই প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটির পরিচালন আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় একক পারফরম্যান্সে এই বড় ধাক্কা লেগেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সময়ে ব্যাংকটির ঋণ থেকে অর্জিত সুদজনিত আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬৫৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে, আমানতকারীদের পেছনে তহবিলের ব্যয় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩০৪ কোটি টাকায়। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই চরম অমিল বা ভারসাম্যের ঘাটতির কারণে ব্যাংকটির নিট সুদজনিত আয় ৬৪৫ দশমিক৭৮ কোটি টাকার বড় ধরনের নেতিবাচক অবস্থানে চলে গেছে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত করে যে, ব্যাংকটি ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে যা আয় করছে, তার চেয়ে আমানতকারীদের অনেক বেশি সুদ বা লভ্যাংশ প্রদান করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রথম প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির নেতিবাচক পুঞ্জীভূত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫১ কোটি টাকায়।

প্রথম প্রান্তিকে রূপালী ব্যাংক পিএলসি-এর মূল আর্থিক সূচক, লোকসানের বিবরণ ও মূলধনের চিত্র নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

আর্থিক সূচক ও বিবরণীসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং পরিসংখ্যানগত অবস্থান
প্রথম প্রান্তিকের একীভূত নিট লোকসান৩৯৬ কোটি টাকা (জানুয়ারি–মার্চ, ২০২৬)
সুদজনিত আয় (হ্রাস ২৩ শতাংশ)৬৫৮ কোটি টাকা
তহবিলের ব্যয় (বৃদ্ধি ১৫ শতাংশ)১,৩০৪ কোটি টাকা
নিট সুদজনিত আয় (নেতিবাচক)৬৪৫ দশমিক ৭৮ কোটি টাকা
প্রথম প্রান্তিক শেষে নেতিবাচক পুঞ্জীভূত আয়৩৫১ কোটি টাকা
শেয়ার প্রতি লোকসানের পরিমাণ৮ টাকা ১২ পয়সা
শেয়ার প্রতি নিট সম্পদের মূল্য (হ্রাস ২৩ শতাংশ)২৭ টাকা ০৫ পয়সা
মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ (২০২৫ সালের শেষ)২০,০১৫ কোটি টাকা (মোট বিতরিত ঋণের ৩৯ দশমিক ০৫ শতাংশ)
প্রয়োজনীয় মোট সঞ্চিতি বা প্রভিশন১৪,০১৪ কোটি টাকা (যা সম্পূর্ণ রাখতে ব্যাংকটি ব্যর্থ হয়েছে)
একক মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত২ দশমিক ৮৮ শতাংশ (ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ)
পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ৪৮৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা (নিয়ন্ত্রক সংস্থার ন্যূনতম চাহিদা ৫০০ কোটি টাকা)

আর্থিক এই চরম বিপর্যয়ের ফলে রূপালী ব্যাংকের শেয়ার প্রতি লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১২ পয়সা। একই সাথে শেয়ার প্রতি নিট সম্পদের মূল্য ২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২৭ টাকা ০৫ পয়সায় নেমে এসেছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের নতুন মূলধন সরবরাহ এবং ঋণ আদায় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার ছাড়া রূপালী ব্যাংকের এই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত অনিশ্চিত।

একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুত করা ২০২৫ সালের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ২০,০১৫ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকটির মোট বিতরিত ও বকেয়া ঋণের ৩৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। এই বিশাল পরিমাণ মন্দ বা খারাপ সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকটির ১৪,০১৪ কোটি টাকার সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, যা সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করতে ব্যাংকটি ব্যর্থ হয়েছে। এই বিশাল প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রূপালী ব্যাংককে বিশেষ নিয়মতান্ত্রিক ছাড় প্রদান করে, যার ফলে প্রভিশন ঘাটতি পুরোপুরি না দেখিয়েই ব্যাংকটি তাদের আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করার সুযোগ পায়।

উক্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মূলধন পর্যাপ্ততার আন্তর্জাতিক নিয়ম বা মানদণ্ড লঙ্ঘনের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ক্যাপিটাল কনজারভেশন বা সংরক্ষণ বাফারসহ যেখানে ন্যূনতম মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে রূপালী ব্যাংকের একক অনুপাত ছিল মাত্র ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং একীভূত অনুপাত ছিল ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংকটির বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ৪৮৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা, যা নিয়মতান্ত্রিক ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা ৫০০ কোটি টাকার চেয়ে কম। এটি আর্থিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকটির সীমিত সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

আর্থিক পরিস্থিতির এই ধারাবাহিক অবক্ষয় ব্যাংকটির শেয়ার বাজারের পারফরম্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রূপালী ব্যাংক পিএলসি-কে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃক ‘জেড’ ক্যাটাগরি বা জাঙ্ক স্ট্যাটাসে অবনমন করা হয়েছে, কারণ ব্যাংকটি টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারেনি। গতকাল পুঁজিবাজারে এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৬ টাকা ১০ পয়সায় নেমে এসেছে। বর্তমানে এই ব্যাংকের প্রধান অংশীদার হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, যাদের কাছে মোট শেয়ারের ৯০ দশমিক ১৯ শতাংশ রয়েছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩base৩২ শতাংশ এবং সাধারণ জনগণের কাছে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

Leave a Comment