বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে কারসাজি রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতা

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ট্রেজারি বা তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রধানদের আগামী দিনগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অনৈতিক কারসাজি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার (১৯ মে, ২০২৬) অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি সভায় এই বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়। দেশের সামগ্রিক মুদ্রা বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

উক্ত সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সুনির্দিষ্টভাবে আশ্বস্ত করে বলেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও মুদ্রা বিনিময় হারে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করবে না। তবে একই সাথে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি বা মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে যেকোনো ধরনের অনৈতিক কারসাজি কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না। সভায় উপস্থিত একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সূত্র থেকে জানা গেছে, গভর্নর মো. মোস্তাফিজুর রহমান দেশের আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থায় গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সকল ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রধানদের আন্তরিক সহযোগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভার মূল সিদ্ধান্ত, প্রস্তাবনাসমূহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাবলি নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভার প্রধান সূচকসমূহসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা
সভা পরিচালনাকারী মূল প্রতিষ্ঠানবাংলাদেশ ব্যাংক (কেন্দ্রীয় ব্যাংক)
সভায় সভাপতিত্বকারী প্রধান কর্মকর্তামো. মোস্তাফিজুর রহমান (গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক)
বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও স্থানমঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ; প্রধান কার্যালয়, ঢাকা
প্রধান নির্দেশনাবলী ও সতর্কবার্তাবৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে সব ধরনের কারসাজি থেকে বিরত থাকা
বাজার নীতি সংক্রান্ত মূল অবস্থানমুক্ত বাজারে হস্তক্ষেপ না করা, তবে কৃত্রিম অস্থিরতা রোধ করা
আন্তঃব্যাংক লেনদেন সংক্রান্ত লক্ষ্যএকটি প্রাণবন্ত ও গতিশীল আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার গঠন
হিসাব সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাবিদেশি ব্যাংকের হিসাব ও দেশীয় খাতার মধ্যকার ব্যবধান কমানো
ভবিষ্যৎ নজরদারি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপনিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ

বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, গভর্নর সভায় স্পষ্ট করে বলেছেন, “আমরা দেশের আর্থিক খাতে একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সুশৃঙ্খল এবং গতিশীল আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার দেখতে চাই।” গভর্নর এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় দেশের সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দুটি পৃথক ধাপে সম্পন্ন করেন।

সভার প্রথম ধাপে গভর্নর মো. মোস্তাফিজুর রহমান শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জ্যেষ্ঠ তহবিল ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের সাথে একান্ত আলোচনা করেন। এই ধাপে তিনি দেশের বর্তমান মুদ্রা বাজারের সামগ্রিক ধরন, লেনদেনের গতিপ্রকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। এর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে কীভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত-ভাসমান বা স্বাধীন এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়, সেই বিষয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ও মূল্যবান মতামত আহ্বান করেন।

সভার দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারণী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। এই ধাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সকল ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রধানদের তাদের দৈনিক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় অবস্থান বা হিসাব সঠিকভাবে প্রস্তুত করার জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন। বিশেষ করে, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিদেশি ব্যাংকের সাথে বৈদেশিক মুদ্রায় যে হিসাব বা খাতা রক্ষণাবেক্ষণ করে, সেই বৈদেশিক হিসাবের সাথে ব্যাংকের নিজস্ব স্থানীয় খাতার আর্থিক ব্যবধান বা অমিল কীভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, সেই বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাবৃন্দ সভায় আরও অবহিত করেন যে, ব্যাংকগুলোর এই নির্দেশনা পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত এবং বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সার্বিক কার্যাবলি ও দৈনন্দিন লেনদেন প্রক্রিয়া সার্বক্ষণিকভাবে কঠোর নজরদারিতে রাখবে।

Leave a Comment