টেক্সটাইল শিল্পের উদ্যোক্তারা গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছেন, কারণ একাধিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক স্থানীয় পশ্চাৎ-সমর্থিত ঋণপত্রের বিপরীতে গ্রহণ করা বিলের বিপুল পরিমাণ অর্থ নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও পরিশোধ করছে না। এতে কয়েক হাজার কোটি টাকা দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকায় উৎপাদন ও ব্যবসা কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাংকারদের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অনাদায়ী বিলের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি থেকে চার হাজার কোটি টাকার মধ্যে দাঁড়িয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করা বিল নির্ধারিত মেয়াদে পরিশোধ বাধ্যতামূলক হলেও বহু ক্ষেত্রে তা বছরের পর বছর ধরে অনাদায়ী রয়ে গেছে।
পশ্চাৎ-সমর্থিত স্থানীয় ঋণপত্র এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যেখানে বিদেশি ক্রেতার মূল ঋণপত্রের বিপরীতে দেশীয় সরবরাহকারীরা কাঁচামাল সরবরাহ করেন। ব্যাংক বিল গ্রহণ করলে তা পরিশোধের আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, যা সাধারণত একশ বিশ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।
অনাদায়ী বিলের চিত্র
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মোট অনাদায়ী বিল | প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা |
| অনাদায়ের সময়কাল | সর্বোচ্চ প্রায় ৫ বছর |
| একটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া | প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| ব্যাংক এশিয়ার অনাদায়ী মামলা | ৪০০টির বেশি |
| টেক্সটাইল খাতে মোট আটকে থাকা অর্থ | প্রায় ৯ কোটি মার্কিন ডলার (সর্বশেষ অনুমান) |
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক জানান, গ্রহণ করা বিলের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ না করার কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা হিসাব থেকে অর্থ কেটে অনাদায়ী বিল নিষ্পত্তি করা হয়। তবে নথিগত বিরোধ থাকলে তা পৃথকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর একটি নির্দেশনা জারি করে জানায়, স্থানীয় ও বিদেশি উভয় ধরনের ঋণপত্রের অর্থ নির্ধারিত মেয়াদে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। নির্দেশ অমান্য করলে অনুমোদিত ডিলার লাইসেন্স বাতিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবুও বাস্তবে অনেক ব্যাংক নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও অর্থ পরিশোধ করছে না। ফলে সরবরাহকারীরা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না এবং উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
একটি শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপক জানান, তাদের প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার বিভিন্ন ব্যাংকে অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। তার মতে, বিদেশি ঋণপত্রের ক্ষেত্রে ব্যাংক নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করে দ্রুত পরিশোধ করলেও স্থানীয় ঋণপত্রের ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, ব্যাংকগুলোর উচিত ছিল অনাদায়ী বিলের বিপরীতে গ্রাহকের নামে বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি করে তা সমন্বয় করা। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা বিল নিয়মের ব্যত্যয় এবং বিষয়টি পর্যালোচনার আওতায় আনা হবে।
নথি অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা কাঁচামালের বিপরীতে পাঁচ বছর আগে গ্রহণ করা বিল এখনো পরিশোধ হয়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে দুই বছরের বেশি সময় ধরে অর্থ আটকে রয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, সময়মতো অর্থ না পাওয়ায় তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, ফলে অতিরিক্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকের মজুরি এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের মতে, ব্যাংকগুলো একই সঙ্গে অর্থ পরিশোধ না করেও ঋণের সুদ আদায় করছে, যা শিল্প পরিচালনায় দ্বৈত চাপ তৈরি করছে। এর ফলে টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
