বৈশ্বিক মন্দাভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় তারল্য সংকটের প্রেক্ষাপটে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে সচল রাখতে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার জারি করা এক সার্কুলারে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিমালা বিভাগ জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে।
সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে পোশাকসহ বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সরবরাহে টানাপোড়েনের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতের বহু প্রতিষ্ঠান চলতি মূলধনের ঘাটতিতে পড়েছে। নগদ প্রবাহে সংকট তৈরি হওয়ায় শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধে বিলম্বের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা সামাজিক ও শিল্পখাতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সচল রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিদ্যমান চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে বিশেষ মেয়াদি ঋণ সুবিধা দেওয়া যাবে। এই ঋণের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা যথাসময়ে পরিশোধ করতে পারবে। তবে ঋণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিগত তিন মাসে প্রদত্ত গড় বেতন-ভাতার বেশি হবে না।
বিশেষ ঋণ সুবিধার প্রধান শর্তাবলি
| বিষয় | শর্তাবলি |
|---|---|
| যোগ্যতা | মোট উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০% রপ্তানিমুখী |
| সচলতার মানদণ্ড | নভেম্বর ২০২৫–জানুয়ারি ২০২৬ সময়ের বেতন-ভাতা পরিশোধ সম্পন্ন |
| ঋণের সর্বোচ্চ সীমা | সর্বশেষ তিন মাসের গড় বেতন-ভাতা |
| সুদের হার | বাজারভিত্তিক প্রচলিত হার |
| প্রত্যয়ন | সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সনদ |
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানিমুখী ও কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে এ সনদ দিতে পারে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং নিটওয়্যার খাতে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি। অর্থাৎ, ন্যূনতম ৮০ শতাংশ উৎপাদন রপ্তানি এবং নির্ধারিত সময়ের বেতন পরিশোধ—এই দুটি শর্ত পূরণ করলেই কেবল বিশেষ ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস। রপ্তানি খাতে স্থবিরতা দেখা দিলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—বিশেষ করে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। তাই শ্রমিকদের বেতন নিশ্চিত করে উৎপাদন চক্র সচল রাখা এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়োপযোগী এই নীতিগত সহায়তা শিল্পখাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
